অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাবের সমস্যায় মহিলারাই বেশি ভোগেন

133 Views 0 Comment

অজ্ঞাতে বা অনিচ্ছায় যখন মূত্র বেরিয়ে আসে অর্থাৎ মূত্রের বেগ ধরে রাখতে না পারার যে সমস্যা তাকেই সাধারণক ইউরিনারি ইনকনটিনেন্স বলে। এই রোগের কারণে সামাজিক বিড়ম্বনার সাথে সাথে শারীরিক সমস্যাও জটিল হয়ে পড়ে।

বিশেষত গর্ভবতী অবস্থায় পেটের ওজন বেড়ে যাওয়াতে মূত্রনালীর ওপর চাপ পড়ে ওই মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিক সন্তান প্রসব এবং ফরসেপ ডেলিভারি ওই মাংসপেশির আরো বেশি ক্ষতি করে। বয়স কম থাকার তখন মাংসপেশির ক্ষতি তেমন বোঝা যায় না। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাবার পর ওই মাংসপেশির দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মূত্রবেগ ধারণ জনিত অক্ষমতায় ভুগতে শরু করার পর অধিকাংশ মহিলা গড়ে পাঁচ বছর পরে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। আসলে সমস্যাটা নিয়ে নিজেরা এতই বিব্রত বোধ করেন যে লজ্জায় কাউকে বলতে পারেন না। অনেকের ধারণা সন্তান জন্মদানের পর এই সমস্যা আসে স্বাভাবিকভাবে। আবার অনেক বার বার টয়লেট যাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। হাস্যকর মনে হলেও সত্যি, অনেক মহিলাকে এই কারণে ন্যাপি পরতেও দেখা যায়। অবশ্য পুরুষদের মধ্যেও দেখা যায় মূত্র না ধরে রাখতে পারার সমস্যা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলারই এই ধরনের সমস্যায় ভোগেন। এর পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকে।

প্রথমত গর্ভধারণ। গর্ভসঞ্চারকালে একজন মহিলার দেহে যে ভিন্নতা আসে তা হল মূত্রথলি ও শ্রেণীদেশের পরির্বতন। এই সময় কিডনি বেশি পরিমাণ মূত্র উৎপাদন শুরু করলে বারে বারে প্রস্রাবের প্রয়োজন হয়। অথচ অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকার কারণে থলি ঠিকমতো খালি হয় না। এই কারণে ইউরিনারি ট্রাক্টে ব্যক্টেরিয়া সংক্রমণ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় মূত্রধারণ জনিত অক্ষমতার সৃষ্টি হয়। এই সময় জরায়ু প্রসারিত হয়ে মূত্রথলিতে বাড়তি চাপ দিতে থাকলে বেশি বার প্রস্রাবের প্রয়োজন পড়ে। প্রায় এক তৃতীয়াংশ মহিলার ক্ষেত্রেই এই বাড়তি চাপের কারণে তাদের অজান্তেই প্রস্রাব বেরিয়ে আসে। এই সমস্যা সন্তান প্রসবের পর ধীরে ধীরে চলেও যায়। তবে শ্রোণীদেশের পেশি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুরা গর্ভধারণকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভবিষ্যতে সমস্যায় সৃষ্টি করে।

অধিক সন্তান, প্রসবের ধরণ, ঘর্ভস্থ সন্তানের ওজন, প্রসবযন্ত্রণাকাল, প্রসবকালীন চাপ প্রয়োগের সময়, সন্তানজন্মদানের পর শ্রোণী অঞ্চলে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বাভাবিক জন্মদানের সময় যোনিপথের পাশের দেওয়াল এবং শ্রোণীতলের পেশির প্রসারিত হয়। এই সব ক্ষতিগ্রস্ত পেশি ও কলা সম্পূর্ণভাবে সেরে ওঠে না, তাই জরায়ুর স্থানচ্যুতির সম্ভাবনা থাকে।

মহিলাদের ঋতু নিবৃত্তির সময় ডিম্বাশয়ের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে রক্তে উস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। এই হরমোনের মাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে শ্রোণীদের পেশি ও কলা ধীরে ধীরে সরু হয়ে পড়ে এবং ভার সহ্য করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এতে যোনিদেশের স্থানচ্যুতি ঘটে।

মহিলাদের শ্রোণীদেশের গঠন মূত্রথলিতে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ায়। মুত্রথলি ও মূত্রথলির মধ্যকার স্থানটি তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায়। ব্যাক্টেরিয়াদের পক্ষে মূত্রথলিতে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটানো সহজ হয়।

উপসর্গ

  • প্রস্রাব পেলে ধরে রাখতে অসুবিধে হয়। কোনো কোনো সময় কাপড়-চোপড়েও হয়ে যায়।
  • বারবার প্রস্রাব করতে যেতে হয়।
  • হাঁচি-কাশি, জোরে হাসাহাসি, শাঁখ বাজানোর সময় কিংবা নীচু হয়ে কাজ করতে গেলে প্রস্রাব বেরিয়ে আসে।
  • টয়লেটে যাবার পথেই প্রস্রাব বেরিয়ে আসে।
  • প্রস্রাব করতে গেলে শুরু হয় দেরিতে, প্রবাহ ঠিকমতো হয় না।
  • বারবার সংক্রমণ ঘটে।
  • প্রোল্যাপ্স বা ওই জায়গায় মাংসপিন্ডের মতো অনুভূত হয়।
  • প্রস্রাব করার পরও মনে হয় আরো কিছুটা হলে ভালো হত।

চিকিৎসা

মূত্র ধারণে অক্ষমতা অনেক কারণ থাকায় সঠিক কারণ জেনে চিকিৎসা করতে হবে। সংক্রমণ জনিত সমস্যা থাকলে প্রথমেই দেখে নেওয়া হয় ইউরিনারি ট্রাক্টে কোনো সংক্রমণ ঘটেছে কি না। এই সংক্রমণকে সহজেই সারিয়ে ফেলা সম্ভব।

পেলভিক ফ্লোর মাংসপেশির ব্যায়াম করলে কিছুটা উপকার পাওয়া সম্ভব। তবে সর্ম্পর্ণভাবে প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার কারণ নিরাময় করার জন্য পেট না কেটে একটি মাইক্রোসার্জারি করা হয়। একদিন হাসপাতালে থাকাই যথেষ্ট।

মূত্রনালি ঢিলে হয়ে যাবার কারণে সমস্যা হয় বলে মূত্রনালির নীচের দিকে ফুটো করে একটি টেপ (টি.ভি.টি) পরিয়ে দিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপারটা লুকিয়ে রেখে চিকিৎসা না করানোর কোনো যুক্তি নেই। অন্য আর পাঁচটা অসুখের মতো এর চিকিৎসাও অবশ্যই সম্ভব। তাই একজন ভালো ইউরো-গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে সুস্থ থাকুন।


সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment