অ্যালজাইমার প্রতিরোধে হোমিওপ্যাথি দাওয়াই

324 Views 0 Comment

প্রথমে আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টে নিই । ১৯০২ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরের এক মানসিক স্বাস্থ্যনিবাসে এক মহিলা ভর্তি হলেন অদ্ভুত কিছু উপসর্গ নিয়ে । অসংলগ্ন কথাবার্তা , প্রচন্ড রাগ , চট করে চেনা লোকের নাম মনে করতে না পারা , ভুলে যাওয়া , কথার মাঝে খেই হারিয়ে ফেলা , আরও অদ্ভুত সব অস্বাভাবিক আচরণ । স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগ নির্ণয় করতে অসমর্থ হন,কারণ স্নায়ু – মনোরোগ সংক্রান্ত চিকিৎসাশাস্ত্রে । এমন ধরনের সব অদ্ভুত লক্ষণের কথা আগে শোনা যায়নি । যাই হোক , চার বছর পরে এই মহিলার মৃত্যু হয় । তখন গবেষকরা তার ব্রেন পরীক্ষা করে খুঁজে পান কিছু স্নায়বিক গোলযোগ । জানা যায় সেনাইল-প্লাক ও নিউরোফাব্রিলারি ট্যাঙ্গল-এর কথা । তারপর প্রথম ১৯৬২ সালে বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতিভ্রংশের কথা জানা যায় । এরপর নানান গবেষণা ওপরীক্ষা পর্যবেক্ষণের পর আবিষ্কার হয়  ‘অ্যালজাইমার ডিমেনশিয়া’ ।

 অ্যালজাইমার রোগের লক্ষণ

• সাম্প্রতিক স্মৃতি অনেককাংশে নষ্ট হয়ে যায়।কাজ চালানোর জন্যে যে ওয়ার্কিং মেমরির দরকার হয় , তার সমস্যা দেখা দেয় । ডাক্তারি পরিভাষায় যার নাম বলা হয় অ্যান্টেরোগ্রেড অ্যামনেশিয়া । রোগী বাড়ির ঠিকানা , ফোন নাম্বার , ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতনিদের নাম গোলমাল করে ফেলে । কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পুরানো বহু স্মৃতি অবিকল মনে থাকে ।

• কোথাও জিনিস রেখে রোগী চট করে মনে করতে পারেনা । স্মৃতির অসুবিধার পাশাপাশি ভাষা ও শব্দ প্রয়োগের অসুবিধা , অঙ্গচালনার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফুর্ত ভঙ্গিমা ব্যবহারের অসুবিধা পরিচিত মানুষ বা জিনিসকে চিনতে না পারা ইত্যাদি অসুবিধা হতে পারে ।

• রোগীর পারিবারিক মেলামেশা সামাজিক ভূমিকা পালনে জটিলতা তৈরি করে ব্যক্তিত্বের বিকার রোগীর মধ্যে জন্ম দেয় বিরক্তি ভাব, উৎকণ্ঠা , মানসিক অবসাদ , নিঃসঙ্গ তা ও সন্দেহ প্রবণতা ।

• ডিল্যুশন ও হ্যালুসিনেশন দেখা দেয় যেমন রোগী হয়তো বলছে — বারান্দার ওই পাশে , অন্ধকারে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘ চারদিক থেকে কেমন যেন দুর্গন্ধ বের হচ্ছে ইত্যাদি ।

• স্নান করাতে , খাবার – দাবার খাওয়াতে বা ওষুধ খাওয়াতে গেলে অ্যালজাইমারস রোগীরা দাতে দাত চেপে রাখেন । অনেককে গালিগালাজ করতেও শোনা যায় ।

• অনেক রোগী দিনে খুব ঘুমান , আর মাঝরাতে উঠে ঘরে বারান্দায় পায়চারি করেন মধ্যরাত্রিতে বাড়ির লোককে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলছেন — আমার জন্যে এখন এক কাপ চা করে দাও । ।

• কেউ কেউ দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে বারং আর একই ধরনের ভুল করেন । আলো-পাখার সুইচ বন্ধ করতে ভুলে যান । সকালে দাঁত মাজার কথা ভুলে যান । খেয়ে উঠে মুখ ধোওয়ার কথা ভুলে যান । কথাবার্তার মধ্যে প্রসঙ্গ হারিয়ে । ফেলেন , অনেকে একই জিনিস বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকেন ।

অ্যালজাইমার কেন হয়

• অ্যামাইলয়েড বিটা প্রোটিন ( A B P ) থিওরি — মানব মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ থেকে অ্যামাইলয়েড প্রিকারসর প্রোটিন ( APP ) , যা অ্যামাইলয়েড প্রোটিন তৈরি করে — যা আসলে এক বিশেষ ধরনের পেপটাইড প্রোডাক্ট । এটা তৈরি করতে সাহায্য করে আলফা সিক্রেটেজ নামক প্রোটিয়েজ ক্যাটালিস্ট । কিন্তু যাদের অ্যালজাইমারস ডিমেশিয়া হয় , তাদের ক্ষেত্রে আলফার জায়গায় ক্ষরণ হয় বিটা বা গামা সিক্রেটেজ — যা অ্যামাইলয়েড প্রিকারসর প্রোটিনকে ভুল জায়গায় নিয়ে যায় । ফলে তৈরি হয় ‘ অ্যামাইলয়েড বিটা প্রোটিন নামক নিউরো – টক্সিক বস্তু । মস্তিষ্কের কার্টন্ন ও হিপ্পোক্যাম্পাসে যা জমা হলে দেখা দেয় নিউরো – ফাইব্রিলারি ট্যাঙ্গ ল , ব্রেন – সেল ডেথ , ভাসকুলার ড্যামেজ ও স্মৃতিভ্রশেতা । রোগী ক্ৰমে অ্যালজাইমার রোগে আক্রান্ত হয় ।

• আর.এন.এ থিওরি — মভি – কোষের অক্সিডেটিভ ড্যামেজ ও মেসেঞ্জার আর.এন.এ মিউটেশনজনিত প্যাথোজেনিক ফ্যাক্টরগুলো থেকে বৃদ্ধ – বৃদ্ধাদের অ্যালজাইমার রোগ হতে পারে ।

• জেনেটিকথিওরি—অটোজোমাল ডমিন্যান্ট জিন, ডি.এন.এ মার্কার ও ক্রোমোজোম – ২১ ইত্যাদির গোলমাল থেকে অ্যালজাইমার হতে পারে ।

আর কীভাবে অ্যালজাইমার রোগের সম্ভাবনা বাড়তে পারে সেগুলে হল

• রক্তে কোলেস্টেরল ও হোমোসিস্টিনের পরিমাণ বাড়লে অ্যামাইলয়েড বিটা প্রোটিনের উৎপাদন বেশি হয় । তখন অ্যালজাইমারসের লক্ষণ প্রকট হয় ।

• হাইপার-থাইরয়েডিজম, ওবেসিটি ও হাই ব্লাডপ্রেসারের কারণে অ্যালজাইমারস রোগ হতে পারে ।

• ডায়াবেটিস ম্যালাইটাস, দীর্ঘকাল ধরে মানসিক অবসাদ , কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ থাকলে অ্যালজাইমারস ও ভাসকুলার ডিমেনশিয়ার সম্ভাবনা বাড়ে ।

• বংশগতিতে বাবা – মা অথবা ভাই – বােনের মধ্যে অ্যালজাইমারসের ইতিহাস থাকলে রোগের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

• অতিরিক্ত মদ্যপান, মাথায় চোট – আঘাত সেরিব্রাল স্ট্রোকের রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় ।

• বহু বছর ধরে কর্মক্ষেত্রে যারা আর্সেনিক , মার্কারি , সীসা ইত্যাদি ধাতুর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসেছেন , তাদের স্মৃতিভ্রংশের প্রবল সম্ভাবনা

• শরীরেভিটামিন – বি, ফোলিয়েট , থায়ামিন , নিয়াসিনের অভাবজনিত কারণে ডিমেনশিয়া দেখা দিতে পারে • পিটুইটারি অ্যাডেনোমা, ব্রেন টিউমার , মেনিনজিওমা প্রভৃতি টিউমার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়লে স্মৃতিভ্রংশ হতে পারে । কেমোথেরাপি ও ব্রেন রেডিওথেরাপির পরে অ্যালজাইমারসের সম্ভাবনা বাড়ে ।

• অ্যান্টি – কোলিনার্জিক ও অ্যান্টি-কনভালস্যান্ট মেডিসিন, অনেক মানসিক রোগের ওষুধ , নিদ্রাহীনতার ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করলে । ডিমেনশিয়ার সম্ভাবনা বাড়ে ।

অ্যালজাইমারস প্রতিরোধে

• ফ্যাট জাতীয় খাবারের ব্যবহার যথা সম্ভব কমিয়ে ফেলতে হবে।

• নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, রোজ ভোরে আধ ঘণ্টা হাঁটা , মানসিকভাবে নিজেকে বিভিন্নভাবে ব্যক্ত রাখা , বন্ধু বান্ধবদের সাথ আচ্ছা আলোচনায় অংশ নেওয়া — এক কথায় কর্মব্যস্ত জীবনযাত্রা এই রোগের সম্ভাবনা হ্রাস করে ।

• কাছের মানুষজনের সাহচর্য , উষ্ণ সহৃদয় ব্যবহার ও ভালোবাসা পেলে বৃদ্ধ বয়সে অ্যালজাইমারস , মানসিক অবসাদ ইত্যাদি রোগের প্রবণতা কমে । তাদের সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটালে , ধৈর্য সরকারে তাদের সুবিধা অসুবিধা বুঝলে তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন এবং জীবনকে নতুন করে উপভােগ করার মানে খুঁজে পাবেন ।

• থাইরয়েড, ওবেসিটি, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগ যেহেতু অ্যালজাইমারস রোগের সম্ভাবনা বাড়ায়, এসব রোগ থাকলে তা যথাশীঘ্র চিকিৎসায় সারিয়ে তুলতে হবে ।

• বিভিন্ন ভিটামিন সমৃদ্ধ টাটকা শাকসবজি নিত্যকার খাদ্যতালিকায় রাখলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশতার সম্ভাবনা কমে ।

অ্যালজাইমারস রোগে উপকারী খাদ্য

• ব্রেনের এনার্জ ফুড হচ্ছে ফ্যাটি অ্যাসিড । যত ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড আছে, তাদের মধ্যে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডই মানব মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় । বিশেষ করে মেমরি মেকানিজম ঠিক রাখার জন্য । মিঠাজলের রুই কাতলা প্রভৃতি পোনা মাছে এবং সার্ডিন, পমফ্রেট ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সামদ্রিক নোনা মাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা – থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে । এই ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ডেকোসা হেক্সায়োনিক অ্যাসিড, যা ব্রেনের সেলুলার ফাংশন ডোপামিন-সেরোটোনিন-এপিনেফ্রিন-গামা অ্যামাইনো বিউটারিক অ্যাসিড ইত্যাদি নিউরোট্রান্সমিটাদের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে বিভিন্ন ধরনের স্মৃতিকে সতেজ রাখে এবং অ্যালজাইমার ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে ।

• স্মৃতিভ্রংশতা প্রতিরোধে অ্যান্টি – অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার-দাবার খুবই উপকারী । কারণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহে সাহায্য করে মেমরি অ্যাক্টিভিটি চাঙ্গা রাখে । এছাড়া শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিক্যালগুলোকে ধবংস করে দেহের নিউরোট্রান্সমিটার সিস্টেমকে শক্তিশালী রাখে । ফুলকপি, টমেটো, পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি, রসুন, বীন, স্ট্রবেরি, আমলকি, খেজুর, কিসমিস প্রভৃতিতে খুবই উন্নতমানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পাওয়া যায় , যা ডিমেনশিয়া রোগীদের জন্য খুবই উপকারী ।

• ভিটামিন-বি৬ থেকে উৎপন্ন কো এনজাইম-পাইরিডক্সল ফসফেট মস্তিষ্কের অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলোর নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে স্মৃতিশক্তিকে সতেজ রাখে । অ্যানথোসায়ানিন নামক মেমরি বুস্টিং ফাইটো-কেমিক্যাল স্মৃতিশক্তি ঠিক রাখতে সাহায্য করে জিঙ্কোবাইলোবা, জিনসেং , ফিনাইল অ্যালানিন এবং সেফালিন ও ফসফটিডিলসারিন নামক দুটি ফসফোলিপিড স্মৃতিহ্রাস রোধ করতে পারে । এইসব উপাদান সমৃদ্ধ টুলা, হেরিং, বান জাতীয়

মাছ, মাছের তেল, মধু, কমলালেবু, মিষ্টি আলু, গাজর, ব্লু-বেরি , আপেল , সানফ্লাওয়ার সীড ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখলে অ্যালজাইমারস রোগীদের স্মৃতি-সমস্যা কমবে ।

অ্যালজাইমারস ও ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা

বৃদ্ধবয়সের রাগ অ্যালজাইমার । সত্যি বলতে কোনো চিকিৎসায় পুরোপুরি সারানো যায় । তবে সময় মতো রোগ নির্ণয় করে বিশেষ ধরনের হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সাহায্যে অসং লগ্ন কথাবার্তা, সন্দেহ বাতিকতা, মনোযোগের অবনতি, স্মৃতিভ্রংশতা ইত্যাদি প্রায় অনেকটাই কমানো যায় । রোগীর অমূলক উত্তেজনা কমানোর জন্য কনস্টিটিউশনাল রেমিডি হিসাবে কোলিন এস্টারেজ ইনহিবিটর জাতীয় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খুবই সুফলদায়ক । রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে মডারেট পোটেন্সির কার্বোনিয়াম সালফিউরেটাস, ব্যানানকিউলাস বালোসাস, নিউৱে পি বা ইত্যাদি ব্যবহৃত হয় । সঙ্গে থেরাপিউটিক মেডিসিন হিসাবে আর্টিমিসিয়া ভালগারিস, সেনেসিও অরিয়েন্স , অ্যাভেনা । স্যাটাইভা প্রভৃতি মাদার টিংচার ও নিম্নশক্তির অ্যামোনিয়াম ব্রোমেটাম ৩x , জিঙ্কাম ভ্যালেরিয়ানা ২x , অ্যাসিড অ্যাগজালিকাম ৬x ইত্যাদি প্রয়োগ রা হয় ।পরে রোগলক্ষণ বৃদ্ধি পেয়ে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে মাইক্রো ডোজ ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হিসাবে ল্যাকেসিস , ক্যালাডিয়াম , হেলিবোরাস ইত্যাদির হাই – পোটেন্সি অথবা ফিফটি মিলিসিমাল স্কেল প্রেসক্রাইব করতে হয় । পাশাপাশি মুড স্টাবিলাইজার হিসাবে ল্যাথাইরাস সাটাইভা ও ( মাদার টিংচার ) এবং ঘুমের সমসার জন্য প্যাসিফ্লোর ইনকানটিা খাওয়াতে হবে । এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের স্মৃতিভ্রংশতা প্রশমনে অনাকার্ডিয়াম, সিফিলিস, অ্যাসিড পিত্রিকাম, মেডোরিনাম প্রভৃতির মধ্যশক্তি ব্যবহার করতে হবে । সঙ্গে স্ট্রিকনিন সালফ ৩x ট্রাইফ্লরেশন খেতে দিলে যাবতীয় স্মৃতিসমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।

অ্যালজাইমারস রোগী ও বাড়ির লোকজনদের কিছু পরামর্শ

• রোগীকে খবরের কাগজ বা পত্রপত্রিকা পড়া , রোজ মর্নিংওয়াক ও সমবয়সী মানুষদের ।সঙ্গে আড্ডা দিতে উৎসাহিত করুন ।

• অধিকাংশ বয়স্ক মানুষই আধুনিক ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নন । তাকে আপনারা সেলফোন ও টিভির রিমোট ব্যবহার করতে শেখান । টিভিতে সুরুসির বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখলে রোগীর মন – মেজাজ ফুরফুরে থাকবে ।

• বাড়ির সবাই মিলে হৈ-হৈ করে তার জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকী পালন করুন । কাছে পিঠের্তাকে বেড়াতে নিয়ে যান । সম্ভব হলে মাঝ মধ্যে তাকে সিনেমা দেখতেও নিয়ে যেতে পারেন । বাড়ির সবাই কোনো অনুষ্ঠানের পার্টিতে গেলে, রোগীকে বাড়িতে একা ফেলে রেখে যাবেন না ।

• মনোযোগ ও স্মৃতি সতেজ রাখতে রোগীর কাছে ছোট নোটবুক দিন । বাড়ির সবার নাম ও ফোন নম্বরগুলো মনে করে লিখতে বলুন । দৈনন্দিন কিছু ঘটনা ডায়েরিতে লিখতে উৎসাহিত করুন

• অ্যালজাইমারস রোগীদের সুনির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলা দরকার । যখন-তখন খাওয়া ও খুশিমতো অত্যধিক ঘুম এই রোগীদের মনোবিকারকে আরো বাড়িয়ে তোলে । ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারা , দাঁত মাজা , সামান্য ব্যায়ামচর্চা , পরিমিত পানাহার , বিকালে একটু বাইরে বেরিয়ে আসা , সন্ধেয় রেডিওতে ভালো গান শোনা বা টিভি দেখা , রাত্রে ডিনারের পরে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোত যাওয়া — এসব রুটিন মাফিক করতে পারলে ভালো ।

• এমন রোগী স্মৃতিসমস্যায় দিন, বার, মাস বছর ইত্যাদি ভুলে যায় । অনেকের সময় বুঝতে অসুবিধা হয় । তাই ঘরে শব্দ করা বড় ঘড়ি দেওয়ালে ক্যালেন্ডার টাঙিয়ে রাখুন । কেমন গরম বা শীত পড়েছে জিজ্ঞাসা করুন । বড়দিন আসার প্রাক্কালে কেক খাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিন শীতকালে পিঠেপুলি খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিন । খুব গরম পড়েছে , সরবত খেতে চান কিনা জিজ্ঞাসা করুন । রবিবার ছুটির দিনে মাংসে বা বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে কি না জেনে নিন ।

• ঘরে-বারান্দায়-উঠোনে রোগীর চলাফেরায় যাতে কোনো অসুবিধা না হয় , সেদিকে নজর রাখুন । যেখানে সেখানে মেঝেতে জল ফেলে রাখবেন না বা আসবাবপত্র অগোছালো করে রাখবেন না । এতে রোগীর পড়ে যাবার সম্ভাবনা বাড়ে । তাকে দেওয়াল ধরে হাঁটতে , সিঁড়ির রেলিং ধরে ওঠা – নামা করতে উৎসাহ দিন । প্রয়োজন হলে সঙ্গে লাঠি রাখার ব্যবস্থা করুন ।

• রোগীকে হালকা টিলেঢালা পোশাক পরতে দেবেন । তার শোবার ঘরে যেন পর্যাপ্ত আলো – বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা থাকে । রাত্রে ঘরে নাইটল্যাম্প জ্বালিয়ে রাখবেন । বাথরুমেও হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখা জরুরি । কারণ বাত – বিরোতে উঠে এই রোগীরা একা একা টয়লেট করতে চলে যায় ।

• আলজাইমারস ডিমেনশিয়ার রোগীর যদি একা একা বাইরে বেরোনোর অভ্যাস থাকে তাহলে তার বুকপকেটে মনে করে সম্পূর্ণ নাম , ঠিকানা , ফোন নম্বর সম্বলিত চিরকুট রেখে দেবেন । বাড়ি ফেরার রাস্তা ভুলে গেলে যাতে কেউ না কেউ তাকে সাহায্য করতে পারেন । অ্যালজাইমার ডিজিজ ও তার ফলে উদ্ভূত ডিমেনশিয়াকে বশে রাখতে রোগীর চারপাশের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণেরাখতে হবে । চোখের সামনে অভিভাবক তথা প্রিয়জনকে ধীরে ধীরে নিঃশেষিত হতে দেখতে , বাড়ির মানুষজনদের একদম ভালোলাগার কথা নয় । পরিবারের সদস্যগণ মিলেমিশে দুঃখ-শোকে ভাগ করে নিলে , তাদের মানসিক যন্ত্রণা অনেকাংশে লাঘব হবে । যিনি বা যাঁরা দিন-রাত রোগীর সঙ্গে থাকেন , তার খাওয়ানো , ধোওয়ানো , দেখাশোনা করেন , তাদের ওপর যে মারাত্মক মানসিক চাপ পড়েবাইরের লোকজনদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় । সকাল থেকে সন্ধে , দিনের পর দিন , মাস পেরিয়ে বছৰ যারা যাবতীয় সুখ – স্বাচ্ছন্দ্যকে পাশেসরিয়ে রেখে অসুস্থ মানুষটাকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসার জন্যে প্রাণপাত করেন তাদের আত্মত্যাগ । ছাড়া এই রোগীদের বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই । রোগীর স্ত্রী , পুত্র বা ধুকন্যা-যিনিইমাসের পর মাস সেবাকর্মে ব্ৰতী থাকেন , তাকে প্রচন্ড ধৈর্য সহকারে , সহানুভূতিশীল হয়ে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয় । বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের থেকে এই রোগ সম্বন্ধে যাবতীয় খুটিনাটি তথ্য জেনে নিয়ে এবং বিভিন্ন মেডিকেল জার্নাল পড়ে রোগীকে দেখভাল করার নিয়ম-কানুন বুঝে নিয়ে একমাত্র কাছেরমানু অ্যালজাইমার রোগীকে আলোর দিশা দেখাতে ও নতুনভা বাচার আনন্দ দিতে পারেন ।

0 Comments

Leave a Comment