আনারস : বহু রোগ নিরাময় করে

58 Views 0 Comment

পুজোপকরণে ফল-মূলগুলোর মধ্যে আম, জাম, কাঠালের পর যেগুলোর নাম আসে তার মধ্যে অন্যতম হল আনারস । আপেল, আঙর, নাসপাতি প্রভৃতিকে বিদেশী ফল বলা হলেও কাঠালি কলা, শশা, কাকুড়ের মতো আনারস কিন্তু এক্কেবারে দেশি ফল । ইতিহাসে যত দুর পাওয়া যায় এই ফলটির ব্যবহার সম্ভবত বঙ্গদেশেই প্রাথমিকভাবে শুরু হয় । পরে দেশ-বিদেশ পরিক্রমা করে চলেছে । গ্রামেগঞ্জে, হাটে-মেলায় ও শহরের মোড়ে মোড়ে সরবত কিংবা রস বা জুস বিক্রির দোকানে আনারসের রস বিক্রি হয় । সবাই খুব তারিফ করেও খায় । তবে এর ভেষজ গুণাগুণ নিয়ে তেমন সচেতনতা বোধ করি তেমন নেই । তাই এই গাছটির সম্বন্ধে সবার মনে নানা জিজ্ঞাসা । এর সম্বন্ধে সংক্ষেপে আলোচনা করে বোধকরি সব প্রশ্নের না হলেও কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ।

বিজ্ঞানসম্মত নাম

অ্যানানাসকমোসাস, ব্রোমিলিয়াসিই গোত্র ।

রাসায়নিক উপাদান

আনারস পাতায় মানুষের প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কতকগুলো ভিটামিন সহ শর্করা, প্রোটিন, লিপিড দ্রব্য, খনিজ লবণ এবং প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, গ্লাইকোসাইড ও উপক্ষার থাকে পরিপক ফলে মনোস্যাকারাইড, সরল প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড সহ ভিটামিন ভিটামিন-সির থাকে । এছাড়া খনিজ উপাদান রূপে প্রচুর ক্যালসিয়াম ফসফরাস, আয়রন, কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচক এবং ব্রোমালিন জাতীয় উপাদান থাকে ।

ভেষজ ব্যবহার

সর্দিগর্মি : বর্ষাকালে গরমের এ প্রায় সব মানুষেরই সর্দিগর্মি রোগ হয় । অনেক সময় এর সঙ্গে পেট খারাপ, মাথাধরা, জ্বর জ্বর ভাব দেখা যায় । কফ, কাশিও হাজির হয় । এক্ষেত্রে পাকা আনারসের রস সাত-আট চামচ সামান্য চিনি মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে ভালো হয় কিংবা দিনের যে কোনো সময় খেলে দ্রুত উপশম হয় । প্রয়োজনে দিনে দু ‘ বারও খাওয়া যেতে পারে ।

মূত্রঘটিত রোগ : বিশেষত প্রবীণদের মুত্রঘটিত কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সে বছরের যে কোনো সময়ে হোকনা কেন আনারস গাছের পরিপুষ্ট মূল এক গাছা নিয়ে ভালো করে ধুয়ে থেতোকরে রস বের করতে হয় । পরে এক চা-চামচ পরিমাণ রসের সঙ্গে সামান্য জল মিশিয়ে দিনে একবার করে দু’-চারদিন নিয়মিত ভাবে খেলে কয়েক দিনের মধ্যে মূত্রঘটিত সব সমস্যা দূর হয় । অবস্থা বুঝে আরো কয়েকদিন খেলে । উপসর্গগুলো সম্পূর্ণভাবে চলে যায় । ।

কৃমি : আয়ুর্বেদবিদদের মতে, তাজা পরিণত আনারস পাতার রস দু ‘-চামচ পরিমাণে নিয়ে জলের সঙ্গে মিশিয়ে সরবত করে তিন-চারদিন সকালে খালি পেটে খেলে বিশেষত বাচ্চাদের কুচো কৃমি সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে যায় । এই কৃমির কারণে বদ হজম ও অন্যান্য উপসর্গগুলোও দূর

অপুষ্টিজনিত রোগ : সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে অপুষ্টির ভালো ওষুধ পাকা আনারসের রস । যতদিন পাকা ফল বাজারে আমদানি হয় ততদিন সম্ভব হলে কিংবা এক সপ্তাহ অন্তত পাকা আনারসের রস ছোট এক গ্লাস পরিমাণে বা দেড়শো গ্রাম থেকে একশো গ্রাম দিনের যে কোনো সময়ে কিংবা প্রাতঃকালে খেলে কয়েক দিনের মধ্যে দেহের পরিবর্তন চোখে পড়ে । দেহের পুষ্টি ও শরীর স্বাস্থ্য পরিবর্তিত হবে । সারা দিনের কাজ সম্পাদনে মনে ও দেহেনতুনভাবে বিশেষ শক্তি অর্জিত হবে ।

কফ-কাশি : ঠান্ডা লেগে গেলে কিংবা সর্দিগর্মির কারণে কাশি হলে, গলা ব্যথা দেখা দিলে কিংবা এর সঙ্গে বুক ব্যথা হলে ও কথা বলতে কষ্ট হলে পাকা আনারসের রস খুবই কার্যকরী ভূমিকা নেয় । এক্ষেত্রে প্রত্যেকদিন সকালে কিংবা বিকেলে আট-দশ চামচ পাকা আনারসের রস সামান্য চিনি মিশিয়ে সরবত করে খেলে ভালো ফল পাওয়া যায় । কয়েক দিনের মধ্যে কাশি দূর হয় ও অন্যান্য উপসর্গগুলো আর থাকে না ।

পেট ফাপা : পাকা আনারসের রস সামান্য নুন ও গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে সরবত করে খেলে কিছুক্ষণের মধ্যে পেট ফাপা ভাবটা দুর হয়ে যায় । তবুও যদি একটু অস্বস্তিভাব থেকে | যায় তাহলে আর একবার এই সরবত খেলে । সম্পূর্ণভাবে এই উপসর্গ চলে যাবে ।

দেহের অনাক্রম্যতা বৃদ্ধি : দেহের অনাক্রম্যতা কমে গেলে যে কোনো রোগশোকের আবির্ভাব হয় । তাই এই অনাক্রম্যতাকে সবার আগে বাড়ানো দরকার । সেই কাজে আনারস খুবই উপকারী । আনারস ফলের রস এক গ্লাস পরিমাণ তিনদিন নিয়মিতভাবে খেলে দেহের মধ্যে পরিবর্তন অনেকটা বোঝা যাবে । পরে কয়েকদিন নিয়মিতভাবে খেলে স্বাভাবিক পুষ্টি-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ছোটখাট উপসর্গগুলো সবই দূর হয় ।

ত্বকের রোগ : গ্রীষ্মের পর বর্ষার শুরুতে গ্রামবাংলায় প্রায়ই অনেকেরই ত্বকে কোনো না কোনো রোগ দেখা দেয় । চুলকানি, খসখসে ভাব, কালচে বর্ণ ধারণ প্রভৃতি হলে পাকা আনারসের রস এক কাপ পরিমাণে কয়েকদিন নিয়মিতভাবে খেলে দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায় ভালো ফল । দেখতে পেলে আরো কয়েকদিন খেতে হয় ।

ফুসফুস ও যকৃতের রোগ : প্রাচীন আয়ুর্বেদ মতে, যকৃতের কারণে দেহে নানা রোগের সৃষ্টি হয় । এই রোগগুলো দুরীকরণের জন্য সিজন ফল হিসেবে আনারসের ব্যবহারে খুবই ভালো ফল পাওয়া যায় । এর সঙ্গে ফুসফুসের রোগগুলোতেও আনারসের পাকা ফলের রস বিশেষভাবে কাজ করে । তাই বাজারে এই ফলটি আমদানি হওয়া । মাত্র অন্তত দিন তিনেক এই রস নিয়মিতভাবে খেলে দ্রুত ফল পাওয়া যায় । এক কাপ আনারস ফলের রসের সঙ্গে পরিমাণমতো চিনি মিশিয়ে সরবত করে খেতে হয় ।

অরুচি : পাকা ফল না পাওয়া গেলে পরিণত পাতার রস দু’-তিন চামচ পরিমাণে নিয়ে সামান্য নুন মিশিয়ে তিনদিন খেলে কিংবা পাকা ফল পাওয়া গেলে এক কাপ পরিমাণ আনারসের ফলের রস নিয়মিতভাবে তিন দিন খেলে অরুচি রোগ দূর হয় । পরে সব রকম খাদ্য খেতে ভালো লাগে ও সহজে হজম হয় ।

পাথুরি : কোনো কোনো আয়ুর্বেদবিদ মনে করেন, নিয়মিতভাবে আট-দশদিন গাছ পাকা আনারস ফলের রস খেলে পাথুরি দূরীভূত হয় ।

পেটের ব্যথা : পাকা আনারস রসের সঙ্গে সাদা জিরে গুঁড়ো ( আধ চামচ ) ও সৈন্দব লবণ সামান্য ) মিশিয়ে দিনে দু ‘ বার নিয়মে খেলে দ্রুত পেটের ব্যথা সেরে যায় ।

অজীর্ণ : বিকেলে পাকা আনারস টুকরো টুকরো করে কেটে মরিচ গুঁড়ো ছিটিয়ে দু-তিন দিন খেলে সব অসুবিধে দূর হয় ।

ডিপথেরিয়া : গাছ পাকা আনারস থেকে রস সংগ্রহ করে এক কাপ পরিমাণে দিনে দু’বার নিয়মে পাঁচদিন খেলে রোগের প্রকোপ ক্রমেকমে ও রোগ নিরাময় হয় ।

গলক্ষত : এক্ষেত্রেও গাছ পাকা আনারস থেকে রস সংগ্রহ করে ( এক কাপ পরিমাণে ) ধীরে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে দিনে দু ‘ বার নিয়মে দু ‘-তিন দিন খেলে দ্রুত রোগ নিরাময় হয় ।

কোষ্ঠকাঠিন্য : ভরা পেটে পাকা আনারস টুকরো টুকরো করে কেটে মরিচ গুঁড়ো ও নুন ছিটিয়ে চার-পাঁচদিন খেলে সব অসুবিধে দূর হয় ।

আধুনিক ভেষজবিজ্ঞানীদের মতে, আনারস পাতা ও পাকা আনারস বেশ কতকগুলো স্ত্রীরোগ, যকৃত রোগ, হৃদরোগ, বেশিরভাগ আন্ত্রিক রোগ, ফুসফুসঘটিত রোগে খুব ভালো কাজ করে ।

বিশেষ পরামর্শ

আনারস গাছ ও এই গাছের ফল খুব একটা দুষ্প্রাপ্য নয় । সিজনে বাজারে তো আমদানি হয়ই । বিশেষত বর্ষাকালে বা গ্রীষ্মের পর এই ফলটি খেলে সুস্বাদু হওয়ার জন্য কেবলনয়, এর ভেষজ গুণাগুণের জন্য মানুষের দেহে প্রভূত উপকার সাধন করে । ভেষজবিজ্ঞানীদের মতে, এই গাছ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ভাবেবহু রোগ প্রতিরোধ এবং নিরাময় করে ।

0 Comments

Leave a Comment