কাদের হতে পারে পিত্তপাথুরি

500 Views 0 Comment
কাদের হতে পারে পিত্তপাথুরি

তিন সন্তানের মা, বয়স ৪৫ বছর, মোটা চেহারা। রোগীর প্রায়ই পেটের ডানদিকের ওপরের অংশে মাঝে মধ্যে হালকা যন্ত্রণা হয়। এই যন্ত্রণা পিঠের ডানদিকে কাঁধের স্ক্যাপুলারের নীচে ছড়িয়ে যায়। চর্বি জাতীয় খাদ্য খাওয়ার পরই সাধারণত যন্ত্রণা বেশি হয়। মাঝে মধ্যে বমি ও পেট ফাঁপা, জ্বর প্রভৃতি লক্ষণ প্রকাশ পায়। গ্রামের পাশ না করা ডাক্তারবাবুকে অনেকদিন দেখাচ্ছিলেন। গ্যাসের ও অন্যান্য লক্ষণভিত্তিক ওষুধ খেয়েও কোনো উপকার হয়নি। পরে শহরের এক ডাক্তারবাবুরা পরামর্শ মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে জানা গেল—পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে। হ্যাঁ, পিত্তথলি ও পিত্তনালীর বিভিন্ন গোলযোগজনিত রোগের মধ্যে ‘পিত্তপাথারি’ সব থেকে বেশি। আবার অন্যভাবে বলা যায়-পিত্তপাথুরি ব্যতিরেক পিত্তথলি সাবধানতা রোগাক্রান্ত হয় না।

পিত্তপাথুরি সাধারণত দু’রকম-কোলেস্টেরলজনিত এবং পিগমেন্টজনিত। উত্তম রকমের দ্বারা সৃষ্ট পাথুরিকে মিশ্র পাথুরি বলা হয়।

  • কোলেস্টেরলজনিত পাথর শিল্পোন্নত দেশগুলিতে সাধারণত দেখা যায়। আবার পিগমেন্টজনিত পাথর উন্নয়নশীল দেশেরমানুষের মধ্যেই বেশি। পশ্চিমের দেশগুলিতে প্রায় ৭৫ শতাংশ পাথর কোলেস্টেরলের পাথর এবং ৭৫ শতাংশ পিগমেন্টের জন্য সৃষ্টি হয়।

ক্যালসিয়াম লবণ যথা ক্যালসিয়াম বিলিরুবিনেট, কার্বোনেট, ফসফেট এবং পামিটেট প্রভৃতি মিলে পিত্তপাথুরি সৃষ্টি হয়।

রোগটির বিষয়ে আলোচনা

৮০-৯০ শতাংশ পিত্তপাথুরিতে আক্রান্তরোগীর শরীরে কোনও লক্ষণই প্রকাশ পায় না। ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭ শতাংশ পুরুষ ও ১৫ শতাংশ মহিলা। ৪০ বছরের কম বয়সী মহিলাদের মধ্যে পিত্তপাথুরি বেশি হয়ে থাকে। সে তুলনায় ভারতবর্ষের ও আফ্রিকার মানুষ কম আক্রান্ত হয়। ভারতবর্ষের মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয়রা আবার পিত্তপাথুরিতে কম আক্রান্ত হয়ে থাকে।

কাদের মধ্যে পিত্তপাথুরি বেশি হতে দেখা যায়

সাধারণত স্থূলকায়, সন্তান ধারণে সক্ষম ফর্সা মহিলা, যাদের বয়স সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, তারাই বেশি পিত্তপাথুরি আক্রান্ত হয়ে থাকেন। উল্লেখ্য, পিত্তপাথুরি পাঁচটি ‘F’ এর সমন্বয়—যেমন Fatty, Fertile, Fair, Female, Forty to Fifty.

পাথর সৃষ্টির কারণ

বিপাকীয়, জীবাণু সংক্রমণ, পিত্ত অবরোধ। কোলেস্টেরলজনিত পিত্তপাথুরিরর রিস্ক ফ্যাক্টর: জাতি, বেশি বয়স, মহিলা, স্থূল, সন্তান সংখ্যা বেশি, সন্তান ধারণের সময়, মধুমেহ, শিরার মাধ্যমে যাদের পুষ্টি দীর্ঘকাল দেওয়া হচ্ছে, পিত্তথলি ও নালীতে পিত্ত অবরোধ, অল্প সময়ে বেশি ওজন হ্রাস হওয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

পিগমেন্টজনিত পাথর তৈরির বিষয়ে যদিও অল্প জানা গেছে। পিত্তনালীর জীবাণু সংক্রমণে জীবাণুর বিটা-গ্লুকুরোনিডেজকে কনজুগেটেড বিলিরুবিন মুক্ত করে ক্যালসিয়াম বিলিরুবিনেট রূপে থিতিয়ে পাথর সৃষ্টি করে।

তাছাড়া, হেমোলাইলিস বা লোহিত রক্তকণিকা ভাঙার ফলে রক্ত বিলিরুবিন বেশি হয়। যেমন-বংশগত স্কেরোসাইটোসিস, সিকলসেল অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া, ম্যালিরিয়া, হৃদযন্ত্রে কৃত্রিম ভালভ প্রতিস্থাপন, যকৃতের সিরোসিস, বিভিন্ন কৃমি সংক্রমণ প্রভৃতি কারণে পিগমেন্টজনিত পাথর সৃষ্টি হয়। প্রসঙ্গত যকৃত থেকে নিঃসৃত পিত্ত লবণ কোলেস্টেরলকে দ্রবীভূত করে। স্বাভাবিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোলেস্টেরলযুক্ত খাদ্য খেলে খুব অসুবিধা হয় না। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক কাজটা বিঘ্নিত হয় সেক্ষেত্রে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি হয়ে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে।

ডিমের কুসুম, মাখন, দুধের সর, যকৃৎ কিডনি, অগ্ন্যাশয়, মাংসের চর্বি প্রভৃতি খেলে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি পায়।

পিত্তপাথুরির কারণে অন্যান্য সমস্যা

  • পিত্তথলিতে—নীরব পাথর অর্থাৎ যখন চুপচাপ পাথর বসে থাকে। আশু বা সদ্য ও দীর্ঘদিন ধরে পিত্তথলির প্রদাহ, গ্যাংগ্রিন, ফুটো হয়ে যাওয়া, পুঁজ হওয়া, ক্যানসার প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়।
  • পিত্তনালীতে—অবরোধের কারণে জনডিস, পিত্তবাহী নালীর প্রদাহ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ প্রভৃতি।
  • অন্ত্রে-অন্ত্রের অবরোধ, গলস্টোন ইলিয়াস প্রভৃতি।

১০ শতাংশ পিত্তপাথুরি এক্স-রে করে নির্ণয় করা সম্ভব। অন্যান্য কোনো রোগ নির্ণয়ের কারণে যেমন ইনট্রাভেনাস ইউরোগ্রাম করার সময় পাথরের উপস্থিতি জানা যায়। উল্লেখ্য যে, পিত্তপাথুরিতে একটি বা অনেকগুলি পাথর দীর্ঘদিন এমনকী সারা জীবন থেকেও কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না।

চিকিৎসা

রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্ট করতে হবে। এমন খাদ্য খেতে হবে যাতে কোলেস্টেরল কম আছে। তাছাড়া মেদ বৃদ্ধি তথা স্থূলতাও অন্যতম কারণ। তাই এমন খাদ্য খেতে হবে যে সমস্ত খাদ্য স্থ্যলত্ব প্রতিরোধ করে।

যদি পিত্তপাথুরি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে কিছু ভেষজ ব্যবহার করলে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেহেতু এই রোগে শল্য চিকিৎসাই একমাত্র নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা, তাই কিছুদিন ব্যবহার করা পরে উপকার না হলে বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা করাই উচিত।

  • হরিতকী—হরিতকী ৫ গ্রাম ও গোক্ষুরচূর্ণ ২ গ্রাম মাত্রায় কুলথুকলাই ভিজানো জল সহ সকাল ও বিকালে কিছুদিন খেলে উপকার হবে।
  • কুলেখাড়া—পাথর পিত্তথলিতে হোক বা কিডনিতে হোক, কুলেখাড়ার বীজ ২-৩ গ্রাম মাত্রায় ২০০ মিলিলিটার জলে মিশিয়ে সকালে কিছুদিন খেতে হবে।
  • কয়েতবেল—কচি কয়েতবেল পাতার রস ১ চা-চামচ করে সকালে ও বিকালে দু’বার করে বেশ কিছুদিন খেলে উপকার হয়।
  • বরুণ—বরুণ ছাল ১০ গ্রাম থেঁতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে  কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে ওই জল সকাল ও বিকালে পান করতে হবে।
  • কুশ—কুশমূল ১২ গ্রাম, গোক্ষুর ৬ গ্রাম ও বরুণ ছাল ৬ গ্রাম থেঁতো করে ৪ কাপ জলে সিদ্ধ করে ২ কাপ থাকতে নামিয়ে ছেঁকে ওই জল বা ক্বাথ সকালে অর্ধেক ও বিকালে অর্ধেক এভাবে চার-পাঁচ সপ্তাহ খেলে উপকার হবে।
  • অগ্নিমন্থ—অগ্নিমন্থ গাছের ছালচূর্ণ ১.২৫ গ্রাম মাত্রায় ঈষদুষ্ণ জল সহ প্রত্যেকদিন সকালে খেলে উপকার হবে।
  • গুলঞ্চ—গুলঞ্চের ক্বাথ ও ১ চা-চামচ মধু সহ বেশ কিছুদিন খেলে কোলেস্টেরল কমবে।
  • রসুন—কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
  • আবার যাদের মেদ বৃদ্ধি হয়েছে তারা শুঁঠ, পিপুল, মরিচ চূর্ণ মধুসহ সকালে নিয়মিত কিছুদিন খেলে মেদ কমবে। মাত্রা ১-২ গ্রাম, মধু ১ চামচ।
  • গুগগুল-সকাল ও সন্ধ্যায় এক থেকে দেড় গ্রাম মাত্রায় আহারের পর ঈষদুষ্ণ জলসহ কিছুদিন খেলে কোলেস্টেরল কমবে।

  • সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন
0 Comments

Leave a Comment