কিডনি প্রতিস্থাপন তেমন ভয়ের কিছুই নেই

299 Views 0 Comment
কিডনি প্রতিস্থাপন তেমন ভয়ের কিছুই নেই

কিডনি প্রতিস্থাপন। কথাটা শুনলেই আঁতকে ওঠাটা কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিল সমস্যায় ভুগতে থাকা রোগীকে একেবারে শেষ চিকিৎসা হিসেবে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিতে পারেন চিকিৎসকরা। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপনকে ঘিরে মানুষের আশষ্কা সহজাত। তাই নিজের হোক, কিংবা প্রিয়জনের, চিকিৎসকদের মুখে কিডনি প্রতিস্থাপনের কথা শুনলেই মানসিক শক্তি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে। অবশ্য চিকিৎসকদের মতে, কিডনি প্রতিস্থাপন ঘিরে যত ভয় আর ভাবনা আছে, তার অনেকটাই আসলে অমূলক। যথার্থ জ্ঞানের অভাবেই এমন আশষ্কা বলে চিকিৎসকরা অভিমত ব্যক্ত করে।

কোন ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়?

কিডনির অসুখের একেবারে শেষ পর্যায়েই সাধারণত কোনো রোগীকে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। যে সময়ে এই পরামর্শ দেওয়া হয়, বুঝতে হবে, সেই সময়ে প্রথাগত চিকিৎসার আর কোনো রাস্তাই নেওয়া যাবে না। কিডনি প্রতিস্থাপনই তখন কাউকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা। আসলে এই প্রতিস্থাপনের মধ্যে দিয়ে জীবন আরও খানিকটা বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন চিকিৎসকেরা। আমরা দেখছি খুব সষ্কটাপন্ন অবস্থায় রোগীদের কিডনি প্রতিস্থাপন করলে ডায়ালাইসিসের থেকে ভালো কাজ দেয়। অন্তত দশ থেকে পনেরো বছর বেশি বাঁচতে পারে রোগী। কমবয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপনের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার হার অনেক বেশি হয়। তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রেও এই প্রতিস্থাপন আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দেয় বইকি। আমরা দেখেছি, পঁচাত্তর বছরের রোগীর ক্ষেত্রেও কিডনি প্রতিস্থাপনের পর তার বেঁচে থাকাটা দীর্ঘায়িত হয়েছে।

কিডনি প্রতিস্থাপনের পর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখা যাবে?

কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রথম ঘটনা ঘটেছিল ১৯৫০ সালে। তারপর চিকিৎসাবিজ্ঞান আরও উন্নত হয়েছে, আরও নতুন নতুন প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন হয়েছে। গোটা ব্যাপারটা আরও বেশি আধুনিক এবং যুগ অনুসারী হয়েছে। ফলে এর সুফল পাচ্ছেন অনেক মানুষ। ভারতেও কিডনি প্রতিস্থাপনের হার ক্রমশ বাড়ছে। তবে হ্যাঁ, কিডনি প্রতিস্থাপন যেহেতু চিকিৎসার একেবারে শেষ পর্যায়, তাই খাওয়া-দাওয়া আর শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে কিছু বাধানিষেধ তো থাকবেই। কিন্তু সে ব্যাপারটা সাধারণ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যার সৃষ্টি করবে না বা করেও না। বরং এটা বলা যায়, কিডনি প্রতিস্থাপন করার পর রোগীরা আরও ভালোভাবে থাকতে পারেন, অন্তত ডায়ালোসিস করানো রোগীদের চেয়ে। ডায়ালিসিস করানো রোগীদের চেয়ে প্রতিস্থাপনের পর মানুষ আরও বেশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পান। অনেক বেশি কর্মক্ষমতা থাকে তাদের, খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা অনেকটা কম।

কিডনি প্রতিস্থাপন কি খুব ব্যয়সাপেক্ষ?

কিডনি সমস্যার শেষ পর্যায়ে রোগীকে হয় ডায়ালিসিস কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপন, যে কোনো একটা বেছে নিতে হয়। ডায়ালিসিসের ক্ষেত্রে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সহ অন্যান্য বহু আনুষঙ্গিক খরচ বহু রয়েছে। তাই একবার কিডনি প্রতিস্থাপন করে নিলে বারবার খরচ এড়ানো যায়।

কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য কোন হাসপাতাল

হাসপাতালের ব্যাপার সবার আগে দেখে নেওয়া দরকার, সেখানে কিডনি প্রতিস্থাপন করে এমন অভিজ্ঞ টিম আছে কি না। সেখানে প্রতিস্থাপনের ইতিহাস কেমন। তারপর দেখে নেওয়া উচিত, সেই হাসপাতালের কিডনি প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত বৈধ স্বীকৃতি আছে কি না। আর তার যথাযথ পরিকাঠামো, পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারগুলো আছে কি না, তাও দেখে নেওয়া জরুরি।

প্রতিস্থাপনের আগে রোগীকে কি নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে হবে ?

কিডনি সমস্যার শেষ পর্যায়ে রোগীকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতেই হয়, সেক্ষেত্রেও তাই। তার বাইরে আরও বলা যায়, কিডনি প্রতিস্থাপন করার আগে সেই ব্যক্তিকে বুকের আর প্রস্রাবের সংক্রমণের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং জল খাওয়ায় চিকিৎসক নিয়ন্ত্রিত পরিমাপ বজায় রাখতে হবে। তাছাড়া নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও জরুরি। নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি যাতে শরীরে বাসা না বাঁধে, সে ব্যাপারেও সতর্কতা নিতে হবে।

যারা ধুমপান করেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের অন্তত এক মাস আগে তাদের সিগারেট খাওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রতিস্থাপন করবেন যারা, সেই চিকিৎসক টিম রোগীর নিয়মিত ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন, চলতি ওষুধগুলো প্রতিস্থাপনের আগে অবধি চালানো জরুরি কি না। নাকি কিডনি প্রতিস্থাপনের আগে অবধি সেসব ওষুধ বন্ধ রাখতে হবে। মহিলারা যারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহার করেন বা হরমোন থেরাপি চালাচ্ছেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের এক মাস আগে থেকে সেগুলো বন্ধ রাখা জরুরি।

কিডনি দাতা কারা হতে পারেন

যে কোনো সুস্থ ব্যক্তিই হতে পারে। কোনো আত্মীয়, চেনা-অচেনা, সন্তান, ভাই-বোন, বাবা-মা যে কেউ হতে পারে। যে কিডনি দান করবে, তার রক্তের গ্রুপ রোগীর সঙ্গে মানানসই হতে হবে। সেটা আর বিচার্য বিষয় নয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে,দাতা যেন কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তি না হয় কিংবা তার জিনবাহিত অসুখ বহন করার কোনো সম্ভাবনা না থাকে। যেমন ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনির অসুখ, লিভারের অসুখ, শরীরের কোষের সমস্যা, এইচ.আই.ভি কিংবা হেপাটাইটিস ইত্যাদির ধারক বা বাহক যেন না হয়।

স্বামী বা স্ত্রী দাতা হতে পারে ?

পারে। সুস্থাস্থ্যের অধিকারী হলেই কিডনি দিতে পারে। বাস্তবে হামেশাই দেখা যায় যেখানে স্ত্রী কিডনি দিচ্ছে তার স্বামীর জন্য। তবে স্বামীর থেকে নিয়ে স্ত্রীকে কিডনি দিতে গেলে সমস্যা দেখা দিলেও দিতে পারে।

কিডনি দাতার শারীরিক ঝুঁকি কতটা ?

যে কোনো বড় সার্জারির যে ঝুঁকি, কিডনি দাতারও সেই ঝুঁকি থাকে। থাকে ব্লিডিং আর সংক্রমণের ভয়ও। তবে কিডনি দিতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ভীষণভাবে বিরল। আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করেছে, কিডনি দান করলে কিডনিজনিত কোনো অসুখ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সম্ভাবনা থাকে না। জীবনযাত্রা একেবারে স্বাভাবিক থাকে। একটা কিডনি নিয়েই মানুষ দিব্যি ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। কারণ গবেষণা দেখাচ্ছে শরীরকে সুস্থ রাখতে গেলে একটা কিডনিই পর্যাপ্ত। কিডনি দান করার পর সুস্থ হলে দাতা আগের জীবন ফিরে আসতে পারে। যেমন অফিস যাওয়া, কাজ করা, গাড়ি চালানো, খেলাধুলো করা ইত্যাদি সবকিছুই চলতে পারে, যেমন চলত। আর হ্যাঁ, সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও এটা কোনো সমস্যা হবে না।

কতদিন পরে কিডনি দাতা স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারে ?

অপারেশনের দু’-তিন সপ্তাহ পরেই। তবে তার কাজের ধরনের ওপর সেটা নির্ভর করে অনেকাংশে। যদি তার কাজে অনেক বেশি শারীরিক ক্ষমতা দরকার হয়, তাহলে সময়টা লাগে বেশি।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment