কী খাবেন, কেন খাবেন

509 Views 0 Comment
কী খাবেন, কেন খাবেন

খেজুর

আমাদের দেশে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। এই কারণে খেজুরের রস তেমন পাওয়া যায় না। খেজুরের রসে তৈরি হয় গুড়। এই গুড় থেকেই পিঠে-পায়েস বানানো যায়। সুস্বাদু স্বাদের জন্যই খেজুরের রস বিখ্যাত।

খেজুর গাছ খুব প্রাচীন উদ্ভিদ। সভ্যতা যখন শুরু হয় সেই সুদূর মেসোপটেমিয়ায়, এখন যার নাম ইরাক, সেখানেই প্রথম খেজুর গাছের জন্ম হয়। পরে এই গাছ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

দীর্ঘজীবী বৃক্ষ খেজুর। এই গাছের ডগায় কাদিতে একসঙ্গে প্রচুর খেজুর ফলে। মরুঅঞ্চলে ও গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে এই গাছ বেশি জন্মায়। খেজুর গাছের বৈজ্ঞানিক নামটি খুবই বড় মোনোকোটাইলেডোনোয়াস।

এক টুকরো খেজুর থাকে প্রচুর শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহ পদার্থ। এছাড়া থাকে নানান খনিজ লবণ। আরব দেশেই সবচেয়ে বেশি খেজুর ফলে। সেই দেশেই লোক প্রতিদিন বাদামের মতোই খেজুর খান। সেই দেশের খেজুরকে বলা হয় ‘তামর’। আরবের মরূদ্যান অঞ্চলের খেজুরই বিখ্যাত। এই খেজুর প্যাকেট-জাত হয়ে বিশ্বের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ইরাকের খেজুরের স্বাদ ভালো। হলুদ ও লাল বর্ণের খেজুর বেশি গ্রহণযোগ্য।

খেজুর নিয়ে কবিদের অনেক লেখনী আছে। হালাবি, জাহিদি এই জাতের খেজুর বিখ্যাত। আমেরিকায় সরকারি তত্ত্বাবধানে খেজুর চাষ করা হয়। পুরনো গাছেরই উদগত অংশ থেকে নতুন চারা গাছ বানানো যায়। পাচ বছর হলেই গাছ ফল দেয়। এই গাছ ৩০ বছর পর্যন্ত বাচে। এক একটি কাঁদিতে প্রায় ৫০ কিলোগ্রাম ফল ফলে। জানুয়ারি থেকে মার্চ এই সময়ে ফল হয়। খেজুর গাছে হাড়ি বেধে রস সংগ্রহ করতে হয়। ইরাকের খেজুর সারা পৃথিবীতে ছড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে উৎপন্ন খেজুরের স্বাদ ভালো। তবে এই খেজুর আকারে ছোট। ভারতের সুস্বাদু খেজুর খুদরাঈ ও হিল্লায়ি। খেজুরের রসেই হয় খেজুরের গুড়।

বীট

বাজারের সবজির মধ্যে বীট আমাদের খুবই চেনা। বীট দু’ধরনের হয়। একটি লম্বা এবং অন্যটি গোল। বীটের খোসা ও ভিতরের শাসের রঙ গাঢ় লাল। এই রঙ থেকেই কেল্টিক ভাষায় এই শিকড়ের নাম ‘বীট’।

বীটের বৈজ্ঞানিক নাম ‘বেটা ভালগারিস’। এটি চেনোপোদিয় গোষ্ঠীয় উদ্ভিদ। আমাদের দেশে বিভিন্ন তরকারিতে ও স্যালাডে বীটের ব্যবহার আছে। ইউরোপে বীট থেকে আচার তৈরি করা হয়। ম্যাঞ্জেলস নামে এক প্রকার বড় বীট আছে। এসব বীট পশুর খাদ্য রূটে ব্যবহার করা হয়।

ইউরোপের দেশগুলোয় বীট খাদ্যরূটে পরিচিতি পেলেও একে মূলত শর্করা রূপে ব্যবহার করা হয়। বীট থেকে তৈরি হয় চিনি। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান এই বীটের চিনির জন্য দেশকে শীর্ষস্থানে অবতীর্ণ করেছিলেন। নেপোলিয়ানের দেশে প্রথম আখের চিনিও তৈরি হয়েছিল। ইউরোপে সাদা রঙের বীট পাওয়া যায়।

মূলো

মূলো খুব প্রাচীন সবজি। খনার বচনে লেখা হয়েছে ‘ষোলো চাষে মূলো’ অর্থাৎ বহু সংখ্যায় মূলো চাষ করা যেতে পারে। কন্দজাতীয় উদ্ভিদ। শীতকালে এই সবচি বাজার দখল করে। কার্তিক থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত লোকে মূলো খায়। নানান তরকারিতে মূলো কাজে লাগে। মূলো-ভাজা খাওয়া যায়। অনেকে কাচা মূলো গ্রহণ করেন।

আমাদের দেশে শঙ্কর জাতের মূলো সৃষ্টি করা হয়। এই মূলো সারা বছর বাচারে পাওয়া যায়। একে রান্নার সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, মূলো বিভিন্ন স্যালাডে ব্যবহুত হয়। মূলো গাছের পাতা শাক রূপে ব্যবহ্রত হয়। আজকাল এগরোলে মূলো দেওয়া হচ্ছে। এটা উচিত নয়।

মূলো গাছের মূল। আকারে চোঙার মতো, নীচের দিকে সরু। গোলাকার মূলোও পাওয়া যায়। মূলোর রঙ সাদা বা লালচে। বাজারে ইদানিং হালকা-গোলাপী রঙের এবং বেগুনী রঙের মূলো এসেছে। এসব সষ্কর জাতের মূলো।

মূলোতে আছে প্রচুর জলীয় ভাব। স্বাদ মিষ্ট ও কিছুটা ঝাঁজযুক্ত। অনেকেই গ্যাস হওয়ার ভয়ে মূলে গ্রহণ করেন না। রান্না করে খেলে মূলো খুবই উপকারি। মূলোর রস হজমে সহায়ক, রুচি বাড়ায়, কন্ঠস্বর ভালো রাখে। যারা নাক, গলা ও চোখের রোগে ভোগেন, তারা অবশ্যই মূলো খাবেন। শ্বাসকষ্টের রোগীদের মূলো ভালো। তবে মনে রাখবেন, পেটের গন্ডগোল থাকলে মূলো খাবেন না।

টম্যাটো

বাজারে যত সবজি পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে পুষ্টিকর টম্যাটো। এই টম্যাটো সবজির দলে নাম লেখালেও বিজ্ঞানীরা একে ফল বলে উল্লেখ করেছেন। সোলানেসি গোত্রের এই ফল খুব প্রাচীনকাল থেকে ফলছে। দক্ষিণ আমেরিকায় প্রথম ফলেছিল টম্যাটো। মেক্সিকোর উপজাতীয় লোকেরা টম্যাটোকে প্রথম খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরে ইউরোপে এই ফল ছড়িয়ে পড়ে।

ইতালিতে টম্যাটোকে বলে সোনালী আপেল। ফ্রান্সের জনগণ টম্যাটোকে ভালোবাসার ফল বলেন। হল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি প্রভৃতি দেশে খুব বেশি ফলে টম্যাটো। ৭০ ডিগ্রি ফারেন হাইট-এর দেশেও ফলে টম্যাটো। আমাদের দেশে জুন মাসে এর চাষ শুরু হয়। ফলন ওঠে ডিসেম্বরে।

টম্যাটোর বীজ খুবই হালকা। ৫০০ গ্রাম বীজ এক হেক্টর জমিতে অনায়াসে চাষ করা যায়। বেলে ও দো-আশ মাটি টম্যাটোর পক্ষে ভালো। মাটিতে নাইট্রোজেন ও ফসফেট সার দিতে হয়। পটাশ সারও ব্যবহার করা হয়।

কিছু ভালো জাতের টম্যাটোর নাম বেস্ট বমি, বেস্ট লার্জ, পুসা, বিজয়, রুবি ইত্যাদি। গাছ একটু বড় হলে কাঠি পুঁতে দিতে হয়। মাঝে মাঝে কীটনাশক ওষুধ দিলে গাছ ভালো থাকে।

টম্যাটোর দ্বারা চাটনি, জেলি, সস বানানো হয়। টম্যাটোতে আছে ভিটামিন-এ, বি এবং সি এছাড়া আছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম। টম্যাটো খেলে গায়ের চামড়া ভালো থাকে। মুখের অরুচি ভাবটা সহজে দূর করতে পারে টম্যাটো। পাকা লাল টম্যাটো সবচেয়ে পুষ্টিকর। বেশি পাকা বা কাঁচা টম্যাটো গ্রহণ করা ঠিক নয়। তবে অনেকেই কাচা টম্যাটোর তরকারি খেতে ভালোবাসেন। প্রায় সব তরকারিতেই টম্যাটো দেওয়া যায়। টম্যাটোতে পুষ্টি মেলে বলেই এই ফল খুবই জনপ্রিয়। অনেক পাকা টম্যাটো এমনি খায়। শিশু, বৃদ্ধ সবারই পছন্দের ফল টম্যাটো।

ধুতুরা

গ্রামাঞ্চলে ও শহরের ঝোপ-জঙ্গলে অসংখ্য ধুতুরা গাছ দেখা যায়। এই গাছে মাইকের মতো ফুল ও কাটাযুক্ত ফল জন্ময়। শিব পুজোর সময় এই ফুল ও ফল কাজে লাগে। আগাছা শ্রেণীর উদ্ভিদ বলেই এই গাছকে লোকে কেটে ফেলে। এই গাছও আমাদের নানাভাবে কাজে লাগে, গাছ যে বিষাক্ত, তা অনেকেই জানেন। তাই এই গাছ লোকে লাগায় না, আপনা থেকেই আগাছা রপে জন্ম নেয়।

ধুতুরা গাছ বেগুন জাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম সোলানেসিয়া। এই গাছের পাতার বিন্যাস হস্তরেখার মতো, সব পাতাই সরল ও বিস্তৃত। দুই রঙের ফুল ফোটে ধুতুরা গাছে, সাদা ও বেগানী। তবে কিছু গাছে হলদে ফুলও ফোটে। প্রত্যেক ফুলেই আছে পাঁচটি বৃত্যাংশ ও পাঁচটি পুংকেশর। এই চেনা ফুলকে অনেকেই কোনো গুরুত্ব দেন না।

ধুতুরা ফুলের বাইরে থাকা কাটা। ভিতরে থাকে বীজ। ফল শুকিয়ে গেলে বীজ মাটিতে পড়ে। আবার চারাগাছের জন্ম হয়। গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোয় এই গাছ বেশি জন্মায়। দক্ষিণ আমেরিকায় এই গাছ সবচেয়ে বেশি আছে। এই গাছের ভেষজুগুণ অনেক। আমাদের দেশে মোট ১৫ রকমের ধুতুরা প্রজানিত আছে। স্ট্রামোনিয়াম জাতের ধুতুরা দিয়েই অনেক ওষুধ প্রস্তুত করা হয়।

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ বেলেডোনা এই গাছের থেকে প্রস্তুত করা হয়। হাপানির চিকিৎসায় এই গাছের ব্যবহার আছে। এছাড়া মানসিক রোগ, নিদ্রাহীনতা, ব্যথা-বেদনা ও দুর্বল ভাব ঠিক করতে ধুতুরা গাছের অনেক অবদান আছে। ধুতুরাকে লোকে নেশার উদ্ভিদ মনে করেন। হিন্দু পুরাণে শিবের পুজোয় ধুতুরা খুবই কাজে লাগে তা বলা হয়েছে। এই ফুলের ও ফলের সৌন্দর্য আছে। তবে এর কার্যকারিতা আরও বেশি।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment