কোমর ব্যথা থেকে হাজার সমস্যা

2024 Views 0 Comment

রোগী যখন কোমরে ব্যথা নিয়ে ডাক্তারবাবুর কাছে যান, সেই ব্যথা খুব সামান্য থেকে তীব্র হতে পারে। ব্যথা বারবার হতে পারে। কোমরের ব্যথা যখন তিন থেকে ছ’মাস পর্যন্ত থাকে তখন সেই ব্যথাকে দীর্ঘস্থায়ী বলা হয়। সাধারণত শতকরা ১৫ জন এই ধরনের ব্যথায় ভোগেন। নানা ধরনের চিকিৎসা করার পরেও ব্যথা সবসময় পুরোপুরি নিরাময় হয় না। এই ধরনের ব্যথা সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

কোমর ব্যথা হওয়ার নানা কারণ আছে। যেমন স্পান্ডিলাইসিস, অস্টিওপোরোসিস, ডিস্ক প্রলাপ্স, ভিটামিন-ডি’র অভাব। এর সাথে যদি কোনো কারণে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে তবে তো অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে। অত্যধিক ওজন বহন কিংবা পরিশ্রমের ফলে এই ব্যথা বেড়ে যায়।

অনেক সময় এই ধরনের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

যেমন—

  • ক্রমাগত একনাগাড়ে ঝুঁকে বসে কাজ করা। বিশেষ করে যাদের টেবিল চেয়ারে বসে কাজ করতে হয় তাদের ক্ষেত্রে কোমরে ব্যথা বেশি হতে দেখা যায়।
  • শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অনেকক্ষণ বসে কম্পিউটারে কাজ করলে কোমরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা  হতে দেখা যায়।
  • স্লিপ্ড ডিস্ক কিংভা কোমরের লিগামেন্টে টান ধরলে সঠিক চিকিৎসার অভাবে কোমরে ব্যথা হতে দেখা যায়।
  • কোমরে প্রদাহজনিত কোনো রোগ বিশেষ করে টিউবারকিউলোসিস, অ্যাম্কোলাইজিং স্পান্ডিলাইটিস, রিউম্যাটয়েড স্পন্ডিলাইটিসের কারণে কোমরে দীর্ঘস্থায়ী  ব্যথা হতে থাকে।
  • কোনো কারণে পেটের অপারেশনের পর, বিশেষ করে জরায়ু, অ্যাপেন্ডিক্স, কিডনি অপারেশনের পর কোমরে ব্যথা ক্রনিক হতে দেখা যায়।
  • জন্মগত বিকৃতি যেমন, স্পাইনাবাইফিডা বা স্কোলিওসিসের জন্য কোমরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে।
  • কোমরের মাংসপেশি দুর্বল হলে মেরুদন্ডের  শক্তি কমে গিয়ে একটা ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে হতে থাকে।
  • কোমরের কশেরুকায় অস্বাভাবিকত্ব থাকলে যেমন লাম্বার ভার্টিব্রাগুলো সেজা হয়ে থাকলে কোমরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে থাকে।

এই ধরনের ব্যথা যখন আবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সেই ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করে শরীরকে কাবু করে তোলে।

আমাদের শরীরের দীর্ঘতম স্নায়ুটি হল সায়টিকা নার্ভ। সায়টিকার লক্ষণ হল কোমরে বা পায়ে, পুরো পা বারবার ঝিনঝিন অনুভূতি, পা নাড়াতে অসুবিধা, পায়ে অসাড়তা, কোমরে ব্যথা অর্থাৎ স্নায়ুতন্ত্রীতে চাপের কারণে এই ধরনের ব্যথা স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। সায়াটিকা হলে প্রচন্ড ঝিনঝিনে বা কনকনে ব্যথা পুরো পায়ে ছড়িয়ে পড়ে।

করণীয়

ডাক্তারবাবুকে দেখিয়ে এক্স-রে করে মেরুদন্ডের কশেরুকার অ্যানটমি কতটা বিঘ্নিত হয়েছে দেখে চিকিৎসা করতে হবে।

কোমরে ব্যথা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে তাহলে কয়েকটি ব্যাপার বিশদে জানতে হবে। যেমন কতদিন ধরে ব্যথা হচ্ছে, ব্যথার তীব্রতা কতটা, কোনো আঘাতের ইতিহাস আছে কি না বা আঘাতের জোর কতটা ছিল, ব্যথা মাঝে মাঝে হয় নাকি একনাগাড়ে অর্থাৎ ব্যথার গতি প্রকৃতি জেনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যথার কারণ বুঝে চিকিৎসা করতে হবে।

চিকিৎসা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলা, ওষুধপত্র, ফিজিওথেরাপি, দরকার মতো ব্যথার ওষুধ, নার্ভের ওষুধ দেওয়া হয়। ভারি জিনিস তোলা,মাটিতে পা মুড়ে (বাবু হয়ে) বসা কিংবা উবু হয়ে বসা চলে না। সামনে ঝুঁকে নীচ থেকে কিছু তুলতেও মানা করা হয়।

ফিজিওথেরাপির মধ্যে আলট্রাসোনিক থেরাপি, শর্টওয়েভ ডায়াথার্মি, ইন্টারফারেন-শিয়াল থেরাপি বেশ উপকার দেয়। কারো কারো ক্ষেত্রে ট্রাকসনের দরকার হয়। এই সমস্ত করে শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা কমে যায়। এরপর যন্ত্রণা কমে গেলে কিছু এক্সারসাইজ করতে হয়। ওষুধপত্র বেশিদিন খেতে হয় না বটে, তবে নিয়ম মেনে চলা ও এক্সারসাইজ খুবই জরুরি। ব্যাক এক্সারসাইজ করতে বলা হয়। দরকারে কোমরের বেল্ট বাঁধতে হতে পারে। এর সাথে থাকে সাময়িক কিছুদিন বিশ্রামে থাকার নির্দেশ।

পরে এই ব্যথা পুনরায় ফিরে আসতে পারে। ভারি কাজ করলে বা অনিয়ম করলে আবার আগের মতো কোমরের ব্যথা শুরু হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিরিয়াস হতে দেখা দেয়। কতকগুলো চিহ্ন দেখে ডাক্তারবাবুরা বুঝতে পারেন ব্যাপারটা সিরিয়াস। যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বলে। যেমন—

  • অন্য কোনো গুরুতর রোগের কারণে কোমর ব্যথা হচ্ছে যা স্পন্ডিলোসিস বা অস্টিওপোরোসিস নয়।
  • স্পন্ডিলোসিস থেকে হচ্ছে, কিন্তু স্পন্ডিলোসিস থেকে এটা অন্য কোনো দিকে টার্ন নিচ্ছে। অন্য কোনো দিক বলতে হয়তো খুব জোর চোট লাগার ফলে হাড় সরে গিয়েছে বা ফ্র্যাকচার হয়েছে। ম্যালিগনেন্সি হয়তো স্পাইন হয়ে ছড়িয়ে গেছে কোমরে। এছাড়া সংক্রমণ যা বোন টিউবারকিউলোসিস থেকে হয়েছে বা অন্য কোনোভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে।
  • রোগীর বয়সটাও দেখতে হবে। বয়স যদি পনেরো হয় তার চিকিৎসা করা যতটা সহজ, বয়স পঞ্চাশ হলে তার যে সিরিয়াস হবে এটা মাথা রাখতে হবে। কোমরে ব্যথার সাথে ওজন কমে যাওয়া, অনেকদিন ধরে জ্বর, সম্প্রতি রোগী হয়তো কোনো সংক্রমণ থেকে সেরে উঠেছে, ইউরিন সংক্রমণ, ‍ুনিউমোনিয়া কিংবা ত্বকের কোনো সংক্রমণ থেকে সে সেরে উঠেছে বা ডায়াবেটিস রয়েছে কিংবা অন্য কোনো অসুখের কারণে স্টেরয়েড খেতে হয়েছে অথবা রোগীর হয়তো এইচ.আই.ভি পজেটিভ আছে, এরকম ক্ষেত্রে কোমরে ব্যথা হলে অন্য সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখতে হবে। এছাড়া চিকিৎসা চলাকালীন রোগীর রোগটা যদি একেবারেই কমতে না থাকে অর্থাৎ রেসপন্স না করে, তাহলে বুঝতে হবে রোগের পিছনে অন্য কোনো কারণ আছে।
  • পায়ে ঝিনঝিন করা ছাড়াও পায়ে যদি প্যারালিসিস দেখা দেয় অথবা কোমরে ব্যথা হতে হতে যদি ফুট ড্রপ দেখা দেয় অর্থাৎ পা-টা যদি নীচে পড়ে ওপরে না ওঠে তাহলে এটা খারাপ লক্ষণ। তার মানে নার্ভটা একদম চেপে গেছে। এছাড়া চামড়ায় কোনো একটা জায়গা অবশ হয়ে গেলে অথবা কোমরে ব্যথার পাশাপাশি প্রস্রাব ঠিকমতো না হলে এগুলো একটু সিরিয়াসলি ভেবে নিয়ে রোগীদের ডাক্তারবাবুর সাথে আলোচনা করা উচিত।

পরীক্ষার মধ্যে রুটিন ব্লাড টেস্টে ছাড়াও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল এম.আর.আই করা। এই ধরনের রোগে এম.আর.আই শেষ কথা। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।

লাগাতার কোমরে ব্যথার একটি অন্যতম কারণ কিন্তু কোষ্ঠকাঠিন্য। এছাড়া কোলাইটিস, আমাশা, অজীর্ণ ইত্যাদি। সেজন্য খাবারের দিকে নজর দিতে হবে। বেশি পরিমাণে শাকসবজি, সপ্তাহে একদিন ইসুবগুলের ভূষি গরম জলের সাথে খেলে পায়খানা পরিষ্কার হবে এবং কোমরের ব্যথাও সেরে যাবে।



সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment