কোলেস্টেরল নিঃশব্দে কেড়ে নিতে পারে প্রাণ

842 Views 0 Comment
কোলেস্টেরল নিঃশব্দে কেড়ে নিতে পারে প্রাণ

প্রাচীন গ্রীক শব্দ ‘ Chole’ এবং‘stereos’-এর সঙ্গে রাসায়নিক প্রত্যয় বিভক্তি ‘ol’ যোগ করে গঠিত হয়েছে কোলেস্টেলর, যার অর্থ একটি জৈব অনু যা জীবকোষে পরিলক্ষিত হয়। কোলেস্টরলের উপাদানগুলো হল কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন। এটি প্রধানত আইসোপ্রপিল মাইরিস্টেট, ইথার, মেথানল, বেঞ্জিন, এসিটোন, ইথানল, ক্লোরফর্ম ও হেক্সান-এ দ্রবীভূত হতে পারে।

কোলেস্টেরল লিপিড বা ফ্যাট গোত্রের স্টেরয়েড বা স্টেরল শ্রেণীভুক্ত। মানবদেহের সবচেয়ে গেুরুত্বপূর্ণ স্টেরল হল এই কোলেস্টরল। শারীরবৃত্তীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য স্টেরলগুলো সঙ্গে এর সাদৃশ্য লক্ষণীয়। এইসব স্টেরলগুলো হল অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স নিঃসৃত হরমোনসমূহ, পরুষ ও স্ত্রী যৌন হরমোন, ভিটামিন-ডি এবং আর্গোস্টেরল। কোলেস্টেরল দেখতে মোম বা চর্বি সদৃশ্য। আমাদের শরীর নিজেই কোলেস্টেরল প্রস্ত্তুত করতে সক্ষম। আবার বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য থেকেও শরীর তা কাজে লাগায়।

কোলেস্টেরল চর্বি ভিত্তিক হওয়ায় রক্তের সঙ্গে মিশতে পারে না। কারণ রক্ত হচ্ছে জলভিত্তিক। তাই কোলেস্টেরল দেহের বিভিন্ন প্রান্তে বাহিত হয় লাইপোপ্রোটিনের সহায়তায়। সাধারণত দু’ধরনের লাইপোপ্রোটিন এই কোলেস্টেরল বহন করে—এল.ডি.এল এবং এইচ.ডি.এল।

কোলেস্টেরলের কাজ

কোলেস্টেরল শরীরে প্রধানত চারটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তাই এটি না হলেআমরা জীকন ধারন করতে পারি না।

  • দেহের কোষপ্রাচীর গঠনে সহায়তা করে।
  • শরীরকে বিশেষ কিছু হরমোন তৈরি করতে সাহায্য করে।
  • হজমকারী পিত্ত অম্লগুলো তৈর করে।
  • শরীরে ভিটামিন-ডি প্রস্ত্তুত করতে সাহায্য করে।

কোলেস্টেরলের অনিষ্টকারী ‍দিক

কোলেস্টেরল একধারে মানবদেহের বন্ধু ও উপকারী। আবার অন্যধারে এটি শরীরের শত্রু ও ক্ষতিসাধনকারী। স্বাভাবিক মাত্রায় এটি শারীরবৃত্তীয় কার্যবলীকে গতিশীল তথা অব্যহত রাখার জন্য একান্ত জরুরি ও অপরিহার্য হলেও রক্তে এর মাত্রা বৃদ্ধি পেলে কোলেস্টেরল তখন এক নিঃশব্দ ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, কোলেস্টেরল মস্তিষ্ক ঘটিত অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ, বন্ধ্যাত্ব ও মহাধমনির কপাটিকা সংক্রান্ত রোগ ঘটিয়ে বিপদে ফেলতে পারে।

কোলেস্টেরলের মাত্রা নির্ধারণ

কোলেস্টেরলের মাত্রা নির্ধারণের জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার দ্বারা মোট কোলেস্টেরল, এইচ.ডি.এলকোলেস্টেরল, এল.ডি.এল কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা জানা যাবে। কুড়ি বছরের অধিক বয়স্কদের অন্তত প্রতি পাঁচ বছরে একবার রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। কোলেস্টেরলের সঠিক মাত্রা জানার জন্য রক্ত দেওয়ার আগে কমপক্ষে নয় থেকে বারো ঘন্টা কোনো খাবার, জল বা ট্যাবলেট গ্রহন করা যাবে না। নীচে কোলেস্টেরলের মাত্রায় এক তালিকা দেওয়া হল—

  • মোট কোলেস্টেরল: স্বাভাবিকভাবে গ্রহনীয় ২০০ এম.জি/ডি.এল.-এর কম। চূড়ান্ত সীমা ২০০-২৩৯ এম.জি/ডি.এল। উচ্চমাত্রা ২৪- এম.জি/ডি.এল বা ততোধিক।
  • এইচ.ডি.এল: নিম্নমাত্রা ৪০ এম.জি/ ডি.এল-এর কম। উচ্চমাত্রা ৬০ এম.জি/ ডি.এল বা ততোধিক।
  • সেরাম ট্রাইগ্লিসারাইড: স্বাভাবিক ৪০-১৪- এম.জি/ ডি.এল।

উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল প্রতিরোধ

উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ হেতু ব্রিটেনের ‘হার্ট’ সংস্থা ছ’টি প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের উল্লেখ্ করেছে—

  • সোয়াবিন থেকে প্রস্তুত খাদ্য প্রতিদিন অন্তত পনেরো গ্রাম করে খেতে হবে। সোয়া মাংস, সোয়দুধ, সোয়াবিন ইত্যাদি পর্যায়ক্রমে।
  • বাদাম বা ছোলা এক মুষ্ঠি পরিমাণ প্রতিদিন।
  • গম জাতীয় খাদ্য প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।
  • উদ্ভিজ্জ স্টেরল সমৃদ্ধ খাবার। যাতে আর্গোস্টেরল, মাইকোস্টেরল, স্টিগমোস্টেরল, সিস্টোস্টেরল থাকে, যেমন সরষের তেল, নারকেল তেল ইত্যাদি প্রতিদিন খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
  • ফল ও সতেজ শাকসবজি অধিক মাত্রায় প্রতিদিন খেতে হবে।
  • অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার যেমন উদ্ভিজ্জ তেল, তিল, তিসি ইত্যাদি প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায় যুক্ত করতে হবে।

এই খাদ্য পদ্ধতি যথাযথা মেনে চললে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

চিকিৎসা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধান

কোলেস্টেরলকে বশে রাখার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিভাবে অবস্থান ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। হাইপারকোলেস্টেরলেমিয়া এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত ঝুঁকির বিষয় লক্ষ রেখে চিকিৎসক চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করে থাকেন। তার সঙ্গে কোলেস্টেরলের মাত্রা অনুযায়ী খাদ্য তালিকা প্রস্তুত ও  ‍মৃদু শরীরচর্চার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। তদুপরি কোলেস্টেরল হ্রাস করে এমন ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে তা সম্পূর্ণভাবে সুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। নিজেই ওষুধ নির্বাচন করে খেলে সমূহ বিপদের সম্ভবনা থাকে। তাই সর্বদাই ওষুধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিন। নিরাপদে থাকবেন।

সাথে সাথে কোলেস্টেরল মুক্ত জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ব্যাপারগুলো একান্তভাবে পালনীয়—

  • নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময় প্রাতঃভ্রমণ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • লিপিড প্রোফাইলে যদি কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড বা অন্য কোনো লিপিডের পরিমাণ বেশি থাকে তবে ফ্যাট জাতীয় খাবার কম করে খেতে হবে।
  • রান্নায় তেলের ব্যবহার কম করতে হবে।
  • ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড, ঘি, মাখন ও চর্বিযুক্ত খাবার বন্ধ করতে হবে।
  • পাঁঠার মাংস সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে হবে। তবে কালেভদ্রে মুরগির মাংস খাওয়া যেতে পারে।
  • ছোট মাছ প্রতিদিনের খাবারের রাখা যেতে পারে।
  • মদ্যপান ও ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে হবে।
  • বর্ধিত দৈহিক ওজন করতে হবে এবং তা বজায় রাখতে হবে।
  • টানা দু’তিন ঘন্টা টিভি দেখা বন্ধ করতে হবে। কারণ এর ফলে শরীরে ক্যালারি তথা মেদ বৃদ্ধি ঘটে।
  • মানসিক দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে হবে।
  • নিজেকে আনন্দদায়ক কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে। যাতে মনটা সর্বদা উৎফুল্ল থাকে।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment