ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটাবেন কী করে

457 Views 0 Comment
ক্যালসিয়ামের ঘাটতি মেটাবেন কী করে

ক্যালসিয়াম এমন একটি উপাদান যা হাড়কে মজবুত ও কর্মক্ষম রাখে। নিরানব্বই ভাগেরও বেশি ক্যালসিয়াম হাড়ে সঞ্চিত থাকে। কোনো বিশেষ রোগ বা বার্ধক্যজনিত কারণে যখন শরীর থেকে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যায় অথচ শরীরে নতুন করে ক্যালসিয়াম তৈরি হয় না তখনই হাড়ে ক্ষয় ধরে, সহজে ফ্র্যাকচার হয়। হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধ খাবারে যথাযথ পরিমাণ ক্যালসিয়াম রাখা উচিত।

মায়ের গর্ভে যখন সন্তান থাকে তখন শিশুর ব্রেন এবং শরীরের গঠনকে মজবুত করে তুলতে গর্ভবতী মায়েদের ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট এবং ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে বলা হয়। এরপর শিশুটি জন্মগ্রহণের পর পেডিয়াট্রিশিয়ানরা সিরাপের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম দিয়ে থাকেন সার্পোট দেওয়ার জন্য।

একজন উঠতি বয়সের ছেলে বা মেয়ের রোজ বারোশো থেকে পনেরোশো মিগ্রাম এর মতো ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। একজন প্রাপ্ত বয়স্ত পুরুষ ও মহিলার দরকার হয় এক হাজার থেকে পনেরোশো মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। একজন মানুষের জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যালসিয়াম উপাদানটি তার শরীরে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

অবশ্য দেহের ওজন ও দেহের হাড়ে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কতটা আছে তার ওপর নির্ভর করে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু এটাও ঠিক ক্যালসিয়াম দরকার বলেই যখন-তখন মুঠো মুঠো ক্যালসিয়াম খাওয়া উচিত নয়। এতে উল্টো বিপত্তি হতে পারে।

ক্যালসিয়ামের ঘাটতি যদি শরীরে থকে তাহলে প্রধানত দুটো উপায়ে তা পূরণ করা যেতে পারে। এক, খাবার ও দুই, ওষুধের মাধ্যমে।

পঞ্চাশ উর্ধ্বে যে সব মানুষ আছেন তাদের দৈনিক খাবারের তালিকায় ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। ক্যালসিয়ামের ঘাটতি যেকে নিয়ে আসে অস্টিওপোরোসিসকে। এছাড়া ৪৫ বছরের পর মহিলাদের অস্টিওপোরোসিস বেশি হতে দেখা যায়। এই সময় এদের মেনোপজ হয়ে যায়, হরমোন নিঃসরণ কমে যায় এবং ফ্র্যাকচারের সম্ভাবনা বাড়ে বলে দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য, সয়া বা নিউট্রিলা অর্থাৎ যেগুলো ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ তা গ্রহণ করতে হবে বেশি বেশি।

এবার আমরা দেখে নেব কী কী খাবারের মধ্যে ক্যালসিয়াম বেশি আছে। সাধারণত দুধ, দই, ছানা, পনির, ছোট মাছ বা চারাপোনা, চিকেন, আপেল, পেয়ারা, সয়াবিন, আটা প্রভৃতি রাখতে হবে ডায়েট। রাজস্থান, পঞ্জাবের লোকেরা বেশি পরিমাণে জোয়ার, বাজরা, রাগি, গম প্রভৃতিকে খাবারের তালিকায় রাখেন বলে ওদের মধ্যে হাড় ভেঙে যাবার প্রবণাতা কম।

ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি’র মধ্যে একটি বড় ধরনের সমঝোতা আছে। ভিটামিন-ডি অন্ত্রে ক্যালসিয়ামের শোষণে সাহায্য করে। পরীক্ষায় প্রমাণিত যে পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের ভিটামিন-ডি’র অভাব ঘটে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মধ্যে অলস জীবন যাপন, কাজকর্মে অনীহা, খাদ্যগ্রহণে অনিচ্ছা, ঘরের মধ্যে সব সময় থাকার ফলে সূর্যালোকের অভাবের কারণে ভিটামিন-ডি’র অভাব ঘটে এবং অস্থিরক্ষার কারণ হয়ে দাড়ায়। খাদ্য ও সূর্যরশ্মি থেকেই ভিটামিন-ডি পাওয়া যায়। দিনের পর দিন আবদ্ধ জায়গায় থাকা এবং সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকার ফলে ডি ভিটামিনের অভাব অস্টিওম্যালেশিয়া এবং হাড় ফ্র্যাকচারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এই কারণে বয়স্কদের ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট খাবার বেশি করে দিতে হবে।

এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে যে, ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামের অভাবে খুব তাড়াতাড়ি ডায়াবেটিস দেখা যাচ্ছে। আবার এটাও দেখা যাচ্ছে খুব বেশি পরিমাণ ক্যালসিয়াম শরীরে প্রবেশ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটাচ্ছে। অনেক সময়ই দেখা যায় শরীরটা দুর্বল লাগছে, হাড়ে ব্যথা করছে তো ক্যালসিয়াম গ্রহণ করছে মানুষ, বাস্তবে তার হয়তো ক্যালসিয়ামের দরকার নেই। অনেক সময় অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম শরীরে জমে কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্থ করে তোলে। কিডনিতে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম জমে পাথর সৃষ্টি করে।

কোন রোগীর শরীরে কত পরিমাণ ক্যালসিয়াম আছে কিংবা আদৌ আছে কি না জানার জন্য একটা সিরাম ক্যালসিয়াম পরীক্ষা করা হয়। এটা একটা ব্লাড টেস্ট। কিন্তু এতেও ঠিক বোঝা যায় না। হয়তো দেখা গেল রিপোর্ট নর্মাল, কিন্তু রোগীর ক্যালসিয়াম ডেফিসিয়েন্সি আছে। তখন ভিটামিন-ডি৩, যা হল ভিটামিন-ডি’র অ্যাক্টিভ ফর্ম, পরীক্ষা করা হয়। তাছাড়া সিরাম ক্যালসিটোনিং-ও একটা ব্লাড টেস্ট। এর সাহায্যে জানা যায় শরীরে কতটা ক্যালসিয়াম ব্রেকডাউন হয়ে যাচ্ছে। হাড় থেকে কতটা ক্যালসিয়াম বেরিয়ে গেল তার পরিমাপ করা যায়। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আছে, তা হল বোন ম্যারো ডেনসিটি পরীক্ষা। একজন রোগীর ক্যালসিয়াম দরকার আছে অথচ কিডনির অবস্থা ভালো নয়। সেক্ষেত্রে বুঝেশুনে ক্যালসিয়াম দিতে হবে। এমন কিছু ট্যাবলেট আছে যেগুলো খেলে যেটুকু দরকার সেইটুকু শরীর গ্রহণ করে বাদবাকিটা মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এগুলো চেক ভালভ সিস্টেমে কাজ করে। তবে বাজারে কিন্তু এগুলো খুব সহজলভ্য নয়।

আর একটা কথা, আয়রন ট্যাবলেটের সাথে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট দেওয়া চলবে না।সকালে আয়রন ট্যাবলেট খেলে বিকেলে ক্যালসিয়াম নেবে। একসাথে খেলে চিলেট ফর্ম করে যেতে পারে। ওটা অ্যাবসর্ভড হবে না, শরীরে জমে যাবে। সবথেকে বড় কথা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত নয়।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment