গর্ভাবস্থায় অপুষ্টির কারণে শিশুর কী কী ক্ষতি হতে পারে

433 Views 0 Comment

গর্ভাবস্থায় মায়ের খাদ্যাভ্যাস যাই থাকুক না কেন, মায়ের জন্য শিশুর অপুষ্টি খুব একটা হয় না। কারণ আমরা দেখেছি, আফ্রিকাতে মায়েরা অত্যন্ত অপুষ্টিতে ভুগলেও কিন্তু পুষ্ট ও সুস্থ বাচ্চা ভূমিষ্ট হয়।

গর্ভাবস্থায় বিশেষ কিছু খাবার নিয়ে আমাদের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে। যেমন কেউ কেউ বলে আনারস খাওয়া যাবে না। পুরোপুরি ভুল ধারণা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিজ খেতে মানা করা হয়ে থাকে। কারণ চিজের মধ্যে কিছু কিছু জীবাণু আছে যা মায়ের শরীরে প্রবেশ করে বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে চিজ একেবারেই খাওয়া যাবে না।

তাহলে গর্ভাবস্থায় মায়ের খাবার হিসাবে কী কী জিনিসকে নিষেধের তালিকায় রাখা হয়েছে? মদ্যপান ও ধূমপান কখনোই করা উচিত নয়। এগুলো বাচ্চার অপুষ্টির কারণ হতে পারে। এর থেকে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক ক্রুটি-বিচ্যুতির সম্ভাবনা থাকে।

প্রশ্ন হল, শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন শিশুর খাদ্য কী? মায়ের গর্ভে থাকাকালীন শিশু কিন্তু কিছু খায় না। শিশু মায়ের শরীর থেকে রক্ত নেয়, আর সেই রক্তটাই শিশুকে পুষ্টি জোগায়। যদি কোনোভাবে মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়, তাহলেই কিন্তু শিশুর পুষ্টির অভাব দেখা দেবে।

মা ও শিশুর মধ্যে রক্ত চলাচলের সংযোগকারী সেতুটি হল ‘ফুল’ বা ‘প্লাসেন্টা’। এই প্ল্যাসেন্টাতে যদি কোনো গন্ডগোল থাকে তাহলে শিশুর শরীরে রক্ত চলাচল ব্যাঘাত ঘটে এবং তার জন্য শিশুর পুষ্টির অভাব হয়।

শিশুর অপুষ্টি বুঝতে হলে

কোনো মানুষ যদি খেতে না পায় তাহলে কোন অংশটা শুকিয়ে যায়? সেটা হল পেট। মাথাটা কিন্তু ছোট হয়ে যায় না। কাজেই গর্ভাবস্থায় বাচ্চার যদি আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয় এবং পেট ও মাথার মাপ নির্ধারণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে মাথা ও পেটের মাপের অনুপাত হবে ১:১। অর্থাৎ শিশু যদি ২৫ সপ্তাহের, আর পেটের মাপও হবে ২৫ সপ্তাহের। ৪০ সপ্তাহের শিশু হলে মাথা-পেট দুটোই ৪০ সপ্তাহের মতো হতে হবে।

যদি আলট্রাসনোগ্রাফি করে দেখা যায় শিশুর পেটের মাপ ও মাথার মাপের থেকে কম, সেক্ষেত্রে কিন্তু অবশ্যই চিন্তার কারণ আছে।

অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় আলট্রাসাউন্ড করে যদি দেখা যায় ২৫ সপ্তাহের একটি শিশুর মাথার মাপ ২৫ সপ্তাহেরই আছে, কিন্তু তার পেটের মাপ ২৩ সপ্তাহের মতো হয়ে রয়ে গেছে, পেটটা চুপসে গেছে, তার মানে সে অপুষ্টিতে ভুগছে। সেক্ষেত্রে মাকে বেশি করে খাইয়ে সমাধান করা যাবে না। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে হবে, ওষুধ ও ইঞ্জেকশনের সাহায্যে।

সাধারণভাব রক্ত যত বেশি ঘন বা গাড় হবে তার প্রবাহ তত কম হবে। রক্ত যত পাতলা বা তরল হবে তার প্রবাহ তত বেশি হবে। তাই এই অপুষ্টির জন্য যে চিকিৎসা তা হল রক্ত তরল করার চিকিৎসা।

রক্ত যদি আবার বেশি তরল বা পাতলা হয়ে যায় তাহলেও সমস্যা থাকে। তাই রক্ত দেওয়ার পর শিশুর ওজন বৃদ্ধি কতটা হল যেমন দেখতে হবে, তেমনি দেখতে হবে শরীরের রক্ত বেশি তরল হয়ে যাচ্ছে না তো! কারণ রক্ত বেশি তরলের ফলে শরীরের অন্য জায়গা থেকে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভেবেচিন্তে ওষুধ বা ইঞ্জেকশনের ডোজ কমাতে-বাড়াতে হয়।

শিশুর পুষ্টির মাধ্যম যেমন প্ল্যাসেন্টা, তেমনই এই প্ল্যাসেন্টা থেকেই কিন্তু জল, অ্যামনিয়োটিভ ফ্লাইড তৈরি হয়। তাই যদি কোনো কারণে প্ল্যাসেন্টায় গন্ডগোল থাকে তাহলে দেখা যায় গর্ভাবস্থায় পেটে জলের পরিমাণ কমে গিয়েছে। শুধু বিশ্রামে রেখে, শুইয়ে রেখে দিলে এই সমস্যার সমাধান হবে না। তাতে রোগ বাড়তে থাকবে, শিশুর ক্ষতিই হবে। এর যথাযথ চিকিৎসা দরকার।

এইসব ক্ষেত্রে দেখা যায় অজ্ঞানতাবশত যথাযথ চিকিৎসা না গর্ভাবস্থায় সেই শিশুটির হঠাৎ করে মৃত্যু হয়ে। শিশুটি আমাদের জানাবার চেষ্টা করে যে ‘আমার বৃদ্ধি হচ্ছে না।’ এক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ড করে দেখতে হবে এবং শুধু দেখা নয়, তার যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে।

মাকে বেশি বেশি খাবার খাওয়ালেই সবসময় শিশুর ঠিকঠাক বৃদ্ধি হয় না। শিশুর বৃদ্ধি কম হলে মাকে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট খাইয়েও সবসময় লাভ হয় না। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা করতে হবে যথাযথ ওষুধ ও ইঞ্জেকশন দিয়ে।

মা খেলে গর্ভের সন্তান ভালো থাকবে কথাটা সর্বৈভাবে না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই ভুল। ভালো করে খেলে মা পুষ্ট হবে এবং তার সন্তানও পুষ্ট হবে খুব সত্যি কথা, কিন্তু কখনো কখনো পুষ্ট সন্তান যে হয় না, তার অজস্র প্রমাণ আছে।

মাকে বেশি খাওয়ালে

 বেশি খাবার খাওয়ালে মায়ের ওজন বাড়বে। গর্ভাবস্থায় সাধারণভাবে একজন মায়ের দশ থেকে পনেরো কিলো অবধি ওজন বাড়ে। এই দশ থেকে পনোরো কিলোর ভাগটা হচ্ছে এরকম—

  • দুই থেকে তিন কিলো শিশুর ওজন। এক কিলো প্ল্যাসেন্টার ওজন।
  • এক থেকে দুই কিলো জলের ওজন। এই জলটাকে অ্যামনিয়োটিক ফ্লাইড বলে।
  • দুই থেকে তিন কিলো ইউটেরাসের ওজন। শিশুর ওজনের সাথে সাথে ইউটেরাসও বাড়তে থাকে।
  • বাকি পাঁচ কিলো মায়ের ওজন বৃদ্ধির কারণে হয়

গর্ভাবস্থায় মায়ের পাঁচ থেকে দশ কিলো বাড়তি ওজন ঠিক আছে। যদি তার থেকে ওজন বেশি বাড়ে সেক্ষেত্রে এইসব মায়েদের সন্তানদের যখন পাঁচ কিংবা দশ বছর বয়স হয়, তখন সেই সব বাচ্চাদের মধ্যে সুগার ও ওবেসিটি হবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেজন্য মাকে সবসময় বেশি বেশি খাওয়াতে হবে, এ ধারণা ঠিক নয় বরং ক্ষতিই করে।

পুষ্টির জন্য মায়ের খাদ্য

তাহলে শিশুর পুষ্টির জন্য মা কী খাবে? পুষ্টির দামি দামি খাবার খেতে হবে তা নয়। যথেষ্ট পরিমাণে শাকসবজি, সঙ্গে মরশুমি ফল এবং মাছ বা মাংস অথবা ডিম কিংবা দুধ যে যেরকম চাইবে খেতে পারে। যতটুকু সে খেতে পারবে ততটুকুই পুষ্টি মিলবে শরীরে। মাছ-মাংস-ডিম ছাড়া যে পুষ্টি হবে না এটাও ভুল ধারণা। কারণ যারা শাকাহারি বা নিরামিষাশী তাদের বাচ্চাদের বা মায়েদের তো পুষ্টি শাকসবজি, ফল, দুধ, দানাশস্য খেয়েই হয়। তারা যেমন দুগ্ধজাত দ্রব্যও খায় না, তেমনি কোনো আমিষও খায় না কিন্তু তাদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে মায়ের পুষ্টিতে কোনো অসুবিধা হয় না।


সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment