গর্ভাশয়ে টিউমার হলে গর্ভপাত হতে পারে বারবার

337 Views 0 Comment

দৃশ্য—এক

কদিন বাদেই সুকন্যার বিয়ে। আজকাল বিয়ের আগে আর ঠিকুজি-কোষ্ঠী নয়, পাত্ৰপাত্রীর রক্তপরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষার দিকেই সবাই জোর দেন। তো সুকন্যার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খুবই কম এসেছে। মাত্র ছ’গ্রাম। সেটা একুশ বছরের মেয়ের যে হতে পারে কেউ কল্পনাও করেনি। পারিবারিক ডাক্তারবাবুর কাছে যেতেই রক্তস্রাব বেশি হয় কি না জিজ্ঞাসা করলেন। উত্তর হাঁ তো বটেই, অত্যধিক বেশি। বিশেষ করে।

গত কয়েকমাস ধরে। ডাক্তার বাবু তক্ষুণি তলপেটের আলট্রা-সনোগ্রাফি করার জন্য উপদেশ দিলেন | আজি এসেছে সেই আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট। জরায়ু দখল করে বসে আসে একটা টিউমার—যার পোশাকি নাম “ফাইব্রোমায়োমা”। এই ফাইব্রোমায়োমা তিন ধরনের হতে পারে—সাবসিরাস অর্থাৎ জরায়ুর বাইরের দিকে, মায়োমেট্রিয়াল—যা জরায়ুর মাং সবেশির মধ্যে এবং এন্ডোমেট্রিয়াল অর্থাৎ জরায়ুর ভিতরের দিকে।

“ফাইব্রোমায়োমা জরায়ুর ভীষণ ভীষণ কমন টিউমার। ২০ থেকে ৪০ শতাংশ মহিলারই কোনো-না কোনো বয়সে ফাইব্রোমায়োমা বলে রিপোর্ট আসে। শ্বেতাঙ্গি নীদের চাইতে আমাদের দেশে প্রায় দ্বিগুণ এর সম্ভাবনা ৷”

সুকন্যার জরায়ুতে। তাই বেচারি এই প্রচন্ড রক্তস্রাবের শিকার হয়েছে। আর এটা থেকে বাচার একমাত্র উপায় হচ্ছে ‘মায়োমেন্টুমি’ অপারেশন করে এটাকে বের করে দেওয়া | তাহলেই ওর রক্তস্রাব কমে আসবে এবং বিয়ে হতে কোনো বাধা থাকবে না। উপরন্তু বিয়ের পর মা হতে গেলেও আর ঝামেলা থাকবে না |

দৃশ্য—দুই

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডাঃ রায়ের প্রচন্ড খ্যাতি। বিশেষ করে যার সন্তান নেই তাদের জন্যে। তনুজা আজকে ডাঃ রায়ের চেস্বরে দেখাতে এসেছে। তনুজার গল্পটা খুবই দুঃখের | বিয়ের পর পরই তার গর্ভে সন্তান আসে, কিন্তু চার মাসের মাথায় সেটা নষ্ট হয়ে যায় | এক বছরের বিশ্রাম নিয়ে তনুজা আবার চেষ্টা করে কিন্তু এবারেও চেষ্টা ফলপ্রসূ হয় না। আবার তিন মাসের মিসক্যারেজ হয়ে যায় | স্বামী ইঞ্জিনিয়ার | হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রামে পোস্টিং হয়েছিল বলে সেরকম ভালো চিকিৎসাও হয়নি। এবারে তাই কলকাতায় মা-বাবার কাছে চলে এসেছে তনুজা যাতে ভালো চিকিৎসা করে সন্তানের মুখ দেখতে পারে।

ডাঃ রায় রুটিন চেক-আপেই বুঝতে পারেন মেয়েটার তলপেটে জরায়ুতে টিউমার রয়েছে আর সম্ভবত সেটাই এইরকম গর্ভপাতের কারণ |

তিনিও আলট্রাসনোগ্রাফি করিয়ে নিয়ে নিশ্চিত হলেন—হ্যাঁ, জরায়ুতে একটি বেশ বড় টিউমার রয়েছে—“ফাইব্রোমায়োমা”। অপারেশনের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল | ল্যাপারোস্কোপি করে। বের করে দেওয়া হল সেই বিঘ্নকারী অবুদিটিকে। ব্যাস, এবারে তনুজার মা হবার সাধে আর কেউ বিঘ্ন ঘটাৱে না |

দৃশ্য – তিন

তিন সন্তানের জননী সুচরিতা পড়েছেন খুব বিপদে। তার বয়স হ’ল আটচল্লিশ, সব মেয়ের বিয়েও দিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে জামাই এসেছে বাড়িতে। রাত্রিতে কী লজ্জা-কী লজ্জা! তলপেট ফেটে যাচ্ছে—বার বার টয়লেটে গিয়েও লাভ হচ্ছে না | টুপটুপ করে দু’চার ফোঁটা পড়া ছাড়া। অসহ্য কষ্ট। শেষে শেষ রাত্রিতে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিয়ে যেতেই হল হাসপাতালে। ওরা তখনকার মতো ক্যাথেটার দিয়ে সুচরিতাকে জন্ত্রণামুক্ত করলেন বটে, কিন্তু পরের দিন আলট্রাসনোগ্রাফিতে ধরা পড়ল সেই ফাইব্রোমায়োমা”| এবারে সে জায়গা পাল্টেছে। ‘সার্ভাই ক্যাল ফাইব্ৰয়েন”|জরায়ুর গলার কাছে বেশ থেকে ইউরিনকে বাইরে বেরোতে বাধা দিচ্ছে মূত্রনালীকে চাপ দিয়ে রেখে। এটার ও প্রতিকার শল্য চিকিৎসা। তবে যেহেতু সুচরিতার আটচল্লিশি, তাই শল্য চিকিৎসার ধরনটাও আলাদা | পোশাকি নাম হচ্ছে ‘টোটাল অ্যাবড়ামিনাল হিস্টেরেক্টমি অ্যান্ড বাইলেটারাল সালপিঙ্গোউফুরেক্টমি”।

এই ফাইব্রোমায়োমা জরায়ুর ভীষণ ভীষণ কমন টিউমার || ২০ থেকে ৪০ শতাংশ মহিলারাই কোনো-না কোনো বয়সে ফাইব্রোমায়োমা বলে রিপোর্ট আসে। দেশে প্রায় দ্বিগুণ এর সম্ভাবনা। খুব কম ক্ষেত্রেই এতে ক্যানসার হতে দেখা যায় | এটার ঝামেলা বলতে বেশি রক্তস্রাব হওয়া | মা হতে বাধা দেওয়া, আর ইউরিনের সমস্যা তৈরি করা | একের বেশিও হতে পারে এই টিউমার, হতে পারে অসং খ্যা | কী কী সমস্যা হতে পারে? আগেই বলা হয়েছে প্রচুর রক্তস্রাব এর প্রথম আর প্রধান সমস্যা | ইউরিন আটকে যাওয়া, কোমর ব্যথা, সন্তানহীনতা বা বার ব্রার গর্ভপাত এগুলোও আছে |

কী করে নিশ্চিত হওয়া যাবে ? বেশিরভাগ সময়েই চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করেই এর অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে যান। তবে রক্ষাকর্তা আলট্রাসনোগ্রাফি তো আছেই| বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দরকার হতে পারে এম.আর.আই স্ক্যানের। বার বার গর্ভপাতের ক্ষেত্রে এই টিউমার কতটা হিস্টেরোসালিপিঙ্গোগ্রাফিও কখনো কখনো জরুরি হয়ে পড়ে |

ম্যালিগন্যান্সি খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়। হাজারে একটি হচ্ছে পরিসংখ্যান | তখন এর পোশাকি নাম হয়। লিওমায়োসার্কোমা”।

চিকিৎসা

ফাইব্রোমায়োমা যদি ছোট হয় বা জরায়ুর বাইরের দিকে হয় এর অবস্থিতি, তখন   রক্তস্রাবের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকে না। কাজেই চিকিৎসকেরাও খুব একটা মাথা ঘামান না এর উপস্থিতি নিয়ে |

কমবয়সী মেয়ে, টিউমারটি ছোট অথচ যদি রক্তস্রাব বেসি হয় তখন কখনো কখনো ওষুধ দিয়ে এর চিকিৎসা করা হয় | এই আশা নিয়ে যদি শল্য চিকিৎসা বা কাটা-ছোড়া এতে পিছিয়ে দেওয়া যায়। শল্য চিকিৎসা এর প্রথম ও প্রধান চিকিৎসা | রোগী যদি বয়স্ক হন, আর তার সংসার যদি ঘর ভর্তি থাকে, তখন “হিস্টেরেক্টমি” বা জরায়ু বের করে দেওয়াই সবচাইতে ভালো। এটা দু’ ভাবে করা যায় | একটা পেট কেটে | করা বলে বা খোলা অর্থাৎ ওপেন অপারেশন। এতে হাসপাতালে একটু বেশি দিন থাকতে হযু | আর ল্যাপারোস্কেপি করে পেট ছিদ্র করে যদি একই অপারেশন |

0 Comments

Leave a Comment