গ্যাসের কষ্টে রেহাই

505 Views 0 Comment
গ্যাসের কষ্টে রেহাই

পেটে গ্যাস জমলে বা ক্রমাগত গ্যাস বাড়তে থাকলে দেহে কী যে কষ্টকর অবস্থা হয় তা যার হয় সে ছাড়া অন্য কেউই বুঝতে পারে না বা অনুমানও করতে পারে না। এই গ্যাসের কারণে পেটের মধ্যে যে জ্বালা-যন্ত্রণা-ব্যথা বা অস্বস্তি হয় তার ফলে দৈনন্দিন সব কাজ বিঘ্নিত হয়, কোনো কাজে মন বসে না বা সে দিনের সব কিছুই বরবাদ হয়ে যায়। পেটে গ্যাস হওয়া বা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে  দেহের অস্বস্তি যেমন হয়, তেমনই তার সঙ্গে বাড়তে থাকে পেটের ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা, বমি বমি ভাব। শুতে-বসতে কোনোটাতেই ভালো লাগে না। ঘুমও হয় না। এইভাবে কয়েকদিন পেটে ক্রমাগত গ্যাস জমলে দেহের পরিপুষ্টি, বিপাক ঠিকমতো না হওয়ায় দেহে ক্লান্তি, অসুস্থতা দেখা দেয়। দেহ শুষ্ক ও শীর্ণ হয়। দেহের অনাক্রম্যতা কমার কারণে দেহে অন্যান্য রোগ সংক্রমণও হতে পারে।

পেটে গ্যাস জমে কেন

সাধারণভাবে বিষয়টি দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমে হজমের গন্ডগোল বা হজমজনিত অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়, পরে পৌষ্টিকনালীতে খাদ্য শোষণ ক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার কারণে দ্রাব্য গ্যাস স্বাভাবিকভাবে শোষিত বা নিষ্কাশিত না হয়ে ক্রমে জমতে থাকে, পরিণামে পেটের মধ্যে জ্বালা, যন্ত্রণা ও আনুষঙ্গিক উপসর্গ দেখা দেয়। সামগ্রিকভাবে এই জ্বালা যন্ত্রণা সবটাই দেহের অনুভূতিমূলক রোগ বা অস্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক সময় এই জমে থাকা গ্যাস পাকস্থলির ফান্ডাস অংশে উর্ধ্বমুখী আঘাত ঘটানোর কারণে বুকে তীব্র ব্যথা, জ্বালা, বমি বমি ভাব হয়। বুকের এই ব্যথাকে হার্টের রোগ বলে বিভ্রান্তিও ঘটে।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীগণ নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর কেবলমাত্র পাশ্চাত্য চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাখাদ্যের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে যোগাসন ও আয়ুর্বেদ বা ভেষজ মেডিসিনের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ভেষজ বিজ্ঞানীদের মতে, স্থায়ীভাবে এই নিরাময়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীনভাবে একমাত্র ভেষজ দ্রব্যাদি ভালো কাজ করে।

গ্যাস নিরাময়ে ব্যবহৃত ভেষজ দ্রব্যাদি

  • বদহজমের কারণে পেটে গ্যাস হলে ও আনুষঙ্গিক কষ্টকর উপসর্গগুলি ক্রমে হাজির হলে হাতের কাছে থাকা বাজারজাত রসুন ভালো করে থেতো করে তার রস ৪-৫ ফোঁটা মতো নিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা জলে মিশিয়ে সরবত তৈরি করে দিনে দু’বার নিয়মিত খেলে গ্যাসজনিত সব কষ্ট সেরে যায়। খাদ্যে রুচি আসে ও অজীর্ণ রোগ থেকে মুক্তি ঘটে।
  • বাজারজাত ধনে ১০ গ্রাম মতো নিয়ে তার সঙ্গে ৫ গ্রাম শুট মিশিয়ে একটু থেতো করে এক কাপ জলে সেদ্ধ করে তৈরি ক্বাথ (সিকি কাপ) দিনে অন্তত দু’বার করে খেলে তিন-চার দিনে নতুন পুরাতন সব গ্যাস রোগ সেরে যায়।
  • পুদিনা গাছের পাতা পেটের গ্যাস জমা রোগে ভালো কাজ দেয়। এক্ষেত্রে সমগ্র গাছ বেটে পাওয়া এক চামচ রস এক গ্লাস জলে মিশিয়ে চিনি দিয়ে সরবত তৈরি করে দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে পেটের অন্যান্য রোগের সঙ্গে গ্যাস জনিত সব উপসর্গ দ্রুত দূর হয়। দেহের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।
  • কমলাগুড়ি ফলের বহিরাবরণ গুড়ো ২-৩ গ্রাম পরিমাণ নিয়ে হালকা উষ্ণ জলের সঙ্গে মিশিয়ে সরবত তৈরি করে খেলে পেটে জমা বায়ু দ্রুত অপসারিত হয়। ব্যথা সেরে যায়। এভাবে দিনে দু’বার নিয়সে তিন-চার দিন খেলে রোগটি চিরতরে সেরে যায়।
  • বলাডুমুর বা ঘটি শেওয়া গাছের মূল ৫ গ্রাম মতো নিয়ে ভালো করে থেতো করে এক কাপ জলে সেদ্ধ করে তার ক্বাথ তৈরি করে দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে গ্যাস ও আনুষঙ্গিক ব্যথা ও অন্যান্য সমস্যা দূর হয়।
  • বদহজমের কারণে পেটে গ্যাস ও আনুষজ্গিক কষ্টকর উপসর্গগুলি দেখা দিলে বাজারজাত মুসুর ডাল (খোসা সমেত) জলে সেদ্ধ করে স্বচ্ছ জলে অংশ আধ ঘন্টা অন্তর খেলে দিনে দিনেই রোগটি চলে যায়। তিন-চার দিন নিয়মিতভাবে খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • বদহজমের কারণে পেটে গ্যাস হলে (নতুন বা পুরাতন উভয় ক্ষেত্রে) গাদা পাতার রস (এক গ্লাস জলে ২ চামচ পরিমাণে) মিশিয়েসরবত তৈরি করে দিনে দু’-তিনবার খেলে সব কষ্টকর উপসর্গ দ্রুত দূর হয়।
  • মুথা ঘাসের ৪-৫টি ভূনিম্নস্থ কান্ড নিয়ে ভালো করে থেঁতো করে ঠান্ডা জলের মধ্যে রাতে রেখে সকালে ছেকে নিয়ে সরবত তৈরি করে দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে নতুন বা পুরাতন পেটের রোগ ও গ্যাস রোগ সেরে যায়।
  • বাজারজাত শ্বেতচন্দন ভালো করে ঘষে বা বেটে এক চামচ মতো নিয়ে ধনে, মুথা, মৌরী ভেজনো জলের সঙ্গে মিশিয়ে সরবত তৈরি করে দিনে দু’বার নিয়মে খেলে পেটের অন্যান্য রোগের সঙ্গে গ্যাস তৈরি হওয়া ও তার জন্য ব্যথা বা কষ্টকর অবস্থা সবই দূর হয়। তিন-চার দিন ক্রমন্বয়ে খেলে ভালো ফল দেয়।
  • তেজপাতা গাছের একমুঠো পাতা জলে সেদ্ধ করে ছেকে পাওয়া এক গ্লাস জল দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে গ্যাস পেটে জমে না। পেটের ব্যথা, বদহজম সব উপসর্গ দূর হয়।
  • নিচুল গাছের বীজ চূর্ণ ১-২ গ্রাম মতো নিয়ে এক গ্লাস জলের সঙ্গে দিনে একবার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে পেটের গ্যাসজনিত সবরকম উপসর্গ দ্রুত দূর হয়। তবে এ ব্যাপারটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে করা  উচিত।
  • কাগজী বাদাম গাছের ফল বিশেষত প্রবীণদের ক্ষেত্রে পেটে গ্যাস জমলে বা গ্যাস জনিত রোগে ভালো ফল দেয়। এক্ষেত্রে ২-৩ টি বাদাম আগের দিন ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে সেই জলে বাদাম বেটে চিনি মিশিয়ে সরবত তৈরি করে দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে সব অসুবিধা দূর হয়।
  • পেটের  কোনো অস্বাভাবিক অবস্থার জন্য ক্রমাগত গ্যাস জমতে থাকলে ও তীব্র ব্যথা অনুভূত হলে হ্রীবের গাছের মূল ২-৩ গ্রাম মতো নিয়ে ভালেঅ করে বেটে জলের সঙ্গে সরবত তৈরি করে খেলে (দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন) দ্রুত রোগ মুক্তি ঘটে।
  • ইন্দ্রাবারুণী মূল চূর্ণ ৫ গ্রামি মতো নিয়ে উষ্ণ গরম জলের সঙ্গে দিনে দু’বার নিয়মে দু’তিন দিন খেলে পেটে গ্যাসের কারণে দেহের সব অস্বস্তি ও ব্যথা বেদনা দূর হয়।
  • সহদেবী গাছের সকল অংশ ছেচে পাওয়া রস (দু’চামচ মতো) হালকা গরম জলের সঙ্গে দিনে দু বার নিয়মে দু-তিন দিন খেলে পেটে গ্যাস জমা হওয়া, তার কারণে ব্যথা-বেদনা ও কষ্টকর অবস্থা ভালো হয়ে যায়।
  • কাচা আমলকি ফল দিনে দুটি করে তিন-চার দিন খেলে ক্রমে পেটে জমা গ্যাস দূর হয় ও সবরকম কষ্টকর অবস্থা থেকে মুক্তি ঘটে। হজম ভালো হয়।

বিশেষ পরামর্শ

পেটে গ্যাস তৈরি ও জমা (বদহজম বা আমাশা বা অম্লপিত্তের কারণে) হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেটের ব্যথার সঙ্গে যে অস্বস্তিকর ও কষ্টকর অবস্থার সৃষ্টি হয় তার থেকে দ্রুত রেহাই পাওয়ার জন্য হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই ব্যবহার করতে মন উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এ সময় পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে ভেষজ দ্রব্য ব্যবহার করলে অতি দ্রুত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ফল পাওয়া যায় ও স্থায়ীভাবে রোগ মুক্তি ঘটে। তবে উল্লিখিত ভেষজগুলির কোনটি ব্যবহার করা ঠিক হবে বা কোনটি বেশি কার্যকরী এই নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নেই। হাতের কাছে যেটি পাওয়া যায় তাকে নিয়েই পরীক্ষা করলেই হল, সামান্য উপকার হলে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা উচিত। যদি কোনো উপকার না পাওয়া যায় তাহলে অন্যটি ব্যবহার করলে অবশ্যই ভালো ফল আশা করা যেতে পারে।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment