ডায়াবেটিস নিরাময়ে ভেষজই নির্ভরযোগ্য

618 Views 0 Comment
ডায়াবেটিস নিরাময়ে ভেষজই নির্ভরযোগ্য

রক্ত শর্করাবা ব্লাড সুগার কথাটি আজকাল প্রায় অনেকের চেনা। ঘরে বাইরে, পথেঘাটে এতই আলোচিত বিষয় যে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার কাছে এই বিষয়টি যেন এখন মুড়ি-মুড়কি। আবার একে নিয়ে বিষ্ময় ও বিস্তর। কারো কারো মধ্যে ভীতিরও সঞ্চার করে। বিশেষত চল্লিশের বেশি যাদের বয়স।

ব্লাড সুগার নিয়ে বহু মানুষ গভীর টেনশনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। টেনশন বা চিন্তার কারণও যে নেই এমন নয়। প্রায়ই শোনা যায় বা ব্লাড সুগারের জন্য প্রেসারের রোগ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি আখছার সবারই হচ্ছে। বাত, বেদনা, আর্থ্রাইটিস, কিডনির রোগ, থ্রম্বোসিস এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মাক ব্যাপারটাও ঘটতে পারে। তাছাড়া প্রাত্যহিক কাজকর্ম করার ক্ষমতা, দেহের অনাক্রম্যতা এই ব্লাড সুগারের জন্য কমে আসে।

চিকিৎসকদের মতে, ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার ঘটিত রোগ, হৃদঘটিত সব রকমের রোগ, মূথ্রঘটিত রোগ বা কিডনির রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সম্প্রতি দেশে-বিদেশে বহু বিজ্ঞানী ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে গবেষণা ও অনুসন্ধান করে চলেছেন। আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী, জাপানের কয়েকজন বিজ্ঞানী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিজ্ঞানী ভেষজ থেকে বেশ কয়েকটি উপাদান আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মধ্যে বেশ কয়েকটি উপায় আছে যেগুলো মানুষের রক্ত শর্করা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। কোনো কোনোটির প্রয়োগ ব্লাড সুগার প্রায় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। তাই আমাদের দেশে কয়েকটি ভেষজ জাত ওষুধও বাজারে চালু হয়েছে।

প্রাচীন ভেষজবিদদের মতানুসারে যে সব উদ্ভিদ থেকে রক্ত শর্করার নিরাময় সম্ভব সেগুলো এই প্রতিবেদনে পরিবেশিত হল।

ব্লাডসুগার নিয়ন্ত্রণে ও ডায়াবেটিস নিরাময়ে ভেষজ ব্যবহার

  • নয়নতারা (ভিসকা রোজিয়া বা ক্যাথার‌্যানথাস রোজিয়াস) গাছের ক্বাথ নিদেন পক্ষে পাতার রস এক চামচ করে প্রতিদিন খেলে কয়েকদিন পরে ব্লাড সুগারের লেভেল সাধারণ হয়ে যায়। ফলে ডায়াবেটিস মেলিটাস বা বহুমূত্র রোগ উপিশম হয়।
  • জাম গাছ বা জামবীজের রস সকালে খালি পেটে জলসহ কয়েকদিন খেলে ডায়াবেটিস রোগে উপশম হয়। এক্ষেত্রে যাদের হাইব্লাডপ্রেসার আছে তার জামবীজের রস খাবেন না।
  • তেঁতুল বীজকে বার্লির মতো রান্না করে প্রয়োজনবোধে চিনি, নুন মিশিয়ে কয়েকদিন খেলে দ্রুত ডায়াবেটিস রোগের উপশম হয়। মতান্তর অষ্কুরিত তেঁতুল বীজ খেলেও ডায়াবেটিসের উপকার হয়।
  • অড়হর পাতার রস (এক চামচ) একটু গরম করে খেলে কিংবা অড়হড় গাছের মূলের ছালের রস বা মূল থেঁতো করে দু’কাপ জলে সেদ্ধ করে আধ কাপ থাকতে থাকতে নামিয়ে রেখে পরে ছেঁকে খেলে বেশি উপকার হয়। এক্ষেত্রে এর সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • বিশেষত কম বয়সে ডায়াবেটিস হলে গাব বীজ কয়েকদিন খেলে ফল পাওয়া যায়। এর খাওয়ার বিধি রোগের গুরুত্ব বুঝে তৈরি করা হয়।
  • তেলাকুচার পাতার রস কিংবা মূলের রস তিন চামচ করে সকালে ও বিকেলে সামান্য গরম করে খেলে তিন-চারদিন পর থেকেই ফল পাওয়া যায়।
  • জয়ন্তী পাতার রস তিন-চার চামচ একটু গরম করে পরে ঠান্ডা হলে অন্তত এক কাপ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।
  • কদলী বা অন্য কোনো মুজা প্রজাতির উদ্ভিদের মোচার রস দু’-তিন চামচ মাত্রায় আট-দশ ফোঁটা খাঁটি মধুসহ দিনে অন্তত দু’বার খেলে তাড়াতাড়ি মধুমেহ ও বহুমূত্র রোগের উপশম হয়।
  • পাষাণভেদ বা কফপাতা গাছ পাতার রস প্রতিবেলায় এক চামচ করে দিনে দু’বার অন্তত খেলে কয়েক দিনের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগের উপশম হয়।
  • চালমুগরার গাছের বীজচূর্ণ আধ বা এক গ্রাম মাত্রায় সকালে ও বিকেলে গরম জলসহ খেলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়।
  • অসন গাছের কান্ডের সার কাঠ কুড়ি গ্রাম পরিমাণ নিয়ে ভালো করে থেঁতো করে আধ লিটার গরম জলে দশ-বারো ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে পরে ছেঁকে নিয়ে সমস্ত জলটাই দিনে তিন-চারবার করে কয়েকদিন খেলে রক্তের শর্করা পরিমাণ ক্রমে কমে যাবে ও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
  • জিয়াপুতা গাছের পাতা দশ গ্রাম মতো নিয়ে আধ সের জলে সেদ্ধ করে আন্দাজ দেড় পোয়া থাকতে থাকতে নামিময়ে ছেঁকে সেই জলটাই সমস্ত দিনে অন্তত তিন-চার বার করে খেলে ডায়াবেটিস রোগ দ্রুত ফল পাওয়া যায়।
  • দুধিলতা বা মেষশৃঙ্গী গাছের পাতার রস প্রত্যহ সকালে এক চামচ মাত্রায় খেলে মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস রোগে দ্রুত ‍উপশম পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে সুগার লেভেল কয়েক দিনেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
  • আমআদা গাছের স্থূলকন্দা বা আদা অংশটি থেঁতো করে তার রস দু’চামচ পরিমাণ প্রত্যহ সকালে খালি পেটে খেলে কয়েকেদিনের মধ্যে মধুমেহ রোগ সেরে যায়।
  • অরিমেদ গাছের কাঠের সারাংশ সাত থেকে বারো গ্রাম ভালোভাবে থেঁতো করে অন্তত আধ লিটার জলে সেদ্ধ করে যখন সেটা দু’কাপ থাকবে তখন তাকে নামিয়ে ছেঁকে নিয়ে জল অংশ সারাদিনে দু’-তিন ঘন্টা কয়েকবার খেতে হবে। কয়েকদিনের মধ্যে রোগ উপশম হবে।
  • মাধবীলতা গাছের তাজা কয়েখটা ফুল সংগ্রহ করে দু’কাপ পরিষ্কার জলে কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে ছেঁকে নিয়ে সমূহ জল অংশটি দিনে অন্তত দু’-তিনবার পান করলে কয়েক দিনের মধ্যে মধুমেহ রোগে উপশম হয়।
  • দুধফলকা গাছ বা চায়া গাছের মূলসহ সমগ্র গাছটিকে ছেঁচে ক্বাথ তৈরি করে ছেঁকে নিয়ে তরল অংশকে প্রথম দিনে তিন-চারবার পরে দু’বার খেলে দ্রুত মধুমেহ রোগে উপশম হয়।
  • নিম গাছের দশটি ভালো তাজা পাতার রসের সঙ্গে পাঁচটি গোলমরিচ নিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে কয়েকদিনের মধ্যে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে আসে বা স্বাভাবিক হয়। এর দ্বারা দ্রুত মধুমেহ সেরে যায়।
  • তুলসীগাছের পাতার রস, কাঁচা হলুদের রস, একটু আখের গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কয়েকদিনের মধ্যে মধুমেহ রোগের উপকার পাওয়া যায়।
  • অগ্নিমন্থ গাছের পাতা শকুনো করে তার চূর্ণ এক গ্রাম পরিমাণ কিংবা কাঁচা পাতা কয়েকটা নিয়ে দিনে দু’বার অন্তত খেলে কয়েক দিনের পর রক্ত শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায় ও ডায়াবেটিস রোগের উপশম হয়।

ডায়াবেটিস রোগের অন্যতম উপসর্গ হল রক্ত শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি। তারও আর কম বেশি এবং ওঠানামার ব্যাপার আছে। ভেষজ দ্রব্য ব্যবহার নির্ভর করে ডায়াবেটিস রোগেরএই স্টেজের ওপর। ঠিক ঠিক মতো স্টেজ নির্বাচন করতে পারলে ঠিক ঠিক মতো ভেষজ প্রয়োগ করা সম্ভব হয় এবং তার সঠিক প্রয়োগের পর উপশমের ব্যাপারেও নির্ভর করা যায়। এক্ষেত্রে রোগটা নির্মূল করা সম্ভব হবে সঠিক ভেষজ প্রয়োগের মাধ্যমে। তবে পার্শ্বাপ্রতিক্রিয়াহীন এই ওষুধটির প্রয়োগ যে কোনো সময় পরীক্ষামূলক হিসেবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। সহজলভ্য, কম মূল্যের এই ভেষজ বা গাছ-গাছালি একটা রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করলে নেপথ্যে বা সকলের অজান্তে দেহের অন্য কোনো রোগ সারাতেও সহায়তা করে। কোনো ব্যাপার ক্ষতির সম্ভাবনা একশো ভাগই নেই বলা যায়। এরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে তা উপকারেই লাগে।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment