দাঁতের রোগ থেকে নানা সমস্যা

596 Views 0 Comment
দাঁতের রোগ থেকে নানা সমস্যা

দাঁতের রোগ নিয়ে বলতে গেলে প্রাথমিকভাবে যে কথাটা মনে আসে তা হল ক্ষয় অর্থাৎ দন্তক্ষয়। এই দন্তক্ষয়ের গ্রামগঞ্জে বা শহরে সব জায়গায় একই রকম।

দন্তক্ষয়কে কেরিজ বলে। অনেক সময় এই কেরিজ খালি চোখে দেখাও যায় না বা বোঝা যায় না। সুতরাং প্রতি ছ’মাস অন্তর হাসপাতাল বা প্রাইভেট চেম্বারে পরীক্ষা করালে কেরিজ বা দাতের অন্য কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করা যায়। দাঁতের কেরিজ প্রাথমিকভাবে ব্যথাহীন হলেও ধীরে ধীরে যখন দাঁতের নরম অংশ পালপে সংক্রমণ হয় তখন যন্ত্রণা শুরু হয়। এটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।

দাঁতের গোড়ায় যখন কেরিজ হয় তখন তাকে বলে রুট কেরিজ। এটি বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কেরিজ যখন পালপকে সংক্রসণ করে তখন তাকে বলে পালপাইটিস।

এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মাড়ির অসুখ আছে। সেখান থেকে যখন রক্ত পড়ে তখন তাকে বলে ডিঞ্জিভাইটিস। দাঁতের গোড়া এবং মাড়িতে যে সংক্রমণ হয় সেটা সাধারণত খাবার জমে থাকার কারণেই। ঠিকমতো জমে যে রোগটি হয় তার নাম পেরিওযন্টাইটিস।

প্রাথমিক অবস্থায় যতি চিকিৎসা না করা হয় তাহলে ধীরে ধীরে পেরিওডন্টাইটিস দাঁতের গোড়া অবধি পৌঁছে যায়। যা ছোট পকেট থেকে একটা গভীর পকেট বা গর্তে পরিণত হয়। খাবারগুলো ওই গর্তে জমা হয়। খাবারগুলো জমে জমে ব্যাক্টেরিয়ার সৃষ্টি হয় এবং দাঁতের যে হাড় নীচে থাকে তার ক্ষয় করতে থাকে। অর্থাৎ ‘অ্যাটনেলার বোনে’র ক্ষতি করে। দাঁতের  সাপোর্ট নষ্ট হয় হাড় ক্ষয়ে যাবার জন্য। দাঁত নড়তে শুরু করে। মুখে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। স্পর্শ করলেই রক্ত পড়তে শুরু করে। অনকে সময় দেখা যায় ঘুমের মধ্যে দাঁত থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। বালিশ ভিজিয়ে দেয় রক্ত। মুখের দুর্গন্ধ সামাজিকভাবে মেলামেশা বন্ধ হয়ে যায়। এই রোগ যে শুধু অশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে আছে তা নয়, শিক্ষিত মানুষ, অর্থবানদের মধ্যেও এই ধরনের দন্তক্ষয়ের রোগ দেখা যায়। এটা ঘটে সচেতনতার অভাবে।

এমন অনেক রোগী আসে কেরিজ নিয়ে যারা বলে ডাক্তারবাবু আমার কোনো অসুবিধে নেই। অর্থাৎ যতক্ষণ না অসুবিধে হবে ততক্ষণ সে ডাক্তারের কাছে যাবে না। রেগুলার চেক-আপ, কী করে দাঁতে ভালো রাখতে হয়, এসব জানার প্রচন্ড অভাব মানুষের মধ্যে। এছাড়া দাঁতের কাঠামো ঠিক না থাকলে খাবার সময় চিবোনোর ফলে ধীরে ধীরে দাঁত ধারালো হয়ে ওঠে। একে বলে ‘অ্যাট্রিকশন’। এর ফলে এনামেল ক্ষয়ে গিয়ে ডেন্টিন বাইরে বেরিয়ে আসে। ডেন্টিনের মধ্যে যে নার্ভগুলো থাকে, তা কোনোকিছু শীতল পানীয়ের সয়স্পর্শে কনকন করে ওঠে।

অনেকের ঘুমোনোর সময় দাঁতে ঘর্ষণ হয়। তাদের চিকিৎসা করানো উচিত। ডেন্টিন যাতে বাইরে বেরিয়ে না আসে তার চিকিৎসা করা উচিত।

এছাড়াও দাঁতের আর একটা রোগ আছে শেপ নষ্ট হয়ে যাওয়া। অনেকেই আছে দাঁত মাজার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে এবং সঠিক জিনিস দিয়ে দাত মাজে না। যেমন অনেকে লাল দন্দন মঞ্জন ব্যবহার করেন। এই মাজন ক্রমাগত ব্যবহার দাঁতের এনামেল উঠে গিয়ে দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে একটা ‘ভি’ আকৃতি তৈরি হয়। এটাও এক ধরনের ক্ষয় রোগ। এর জন্য ঠান্ডা জল, ঠান্ডা পানীয়, সবকিছু বাদ দিতে হয়।

এছাড়া মাতৃগর্ভে থাকার সময় যদি মায়ের খুব জ্বর, পক্স বা মিজলস হয় তাহলে শিশুটির দাঁতের গঠন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। তার ফলে দাঁতের আভ্যন্তরীণ শক্তি ব্যাহত হয় এবং দাঁতের এনামেল আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এনামেলগুলো ভেঙে পড়ে। একে বলে এনামেল হাইপোপ্লাসিয়া।

আজকাল গুটখা জাতীয় নেশার বস্তুর প্রতি মানুষের আসক্তি বেড়ে গেছে। এর ফলে অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে যতটা মুখ খোলা উচিত ততটা খুলছে না, গরম খাবার বা ঝাল খাবার খেতে পারছে না। গালের মধ্যে সবসময় একটা জ্বালা ভাব। নিয়মিত গুটখা খাওয়ার ফলে যতটা মুখ হা করে খোলা উচিত ততটা খুলছে না। একে বলে ‘ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস’।

গুটখার ব্যবহার শুধু বাইরের সৌন্দর্যই নয়, ধীরে ধীরে মুখ ক্যানসার ‍সৃষ্টি হয়। গুটখা ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে না আনতে পারলে ধীরে ধীরে মুখে ক্যানসার সম্ভবনা শতকরা ৯০ ভাগে গিয়ে দাঁড়াবে।

আর একটা বিষয় দেখা দরকার, সেটা হল উচু-নীচু দাঁত। দুধের দাঁত ঠিক সময়ে না পড়ার জন্য এবং মা-বাব সচেতন না হওয়ার জন্য দাঁতের সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে যায়। দাঁতের কর্মক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে মুখের সৌন্দর্যের সাথে সাথে দাঁতের কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলা যায়।

দাঁত পরিচর্যা

  • প্রত্যেক বার খাওয়ার পর মুখ কুলকুচি করতে হবে।
  • বড় কিছু খাওয়ার পর ব্রাশ করতে হবে।
  • ব্রাশ করতে হবে ওপর থেকে নীচে।
  • দুটো দাঁতের মাঝখানে কোনো ব্রাশ প্রবেশ করতে পারে না, তাই ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে।
  • প্রতিদিন রাতে শুতে যাবার আগে উষ্ণ গরম জলে অল্প নুন দিয়ে কুলকুচি করতে হবে। যাদের হাইপ্রেসার আছে তারা নুন না দিয়ে উষ্ণ গরম জলে কুলকুচি করবেন।

 না করলে কী হবে

মাড়ি ও দাঁতের গোড়ায় অথবা দুটো দাঁতের মাঝখানে খাবারের কণা জমতে জমতে একটা শক্ত মাস্ক থৈরি হবে। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে ক্যালকুলাস, সেই ক্যালকুলাস কিন্তু দাঁতের মাড়ির ক্ষতি করে এবং জিঞ্জিভাইটিস রোগের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দেয়। পরে পেরিওডনটাইটিস হেয়।

প্রতি দু’বছর অন্তর অন্তর এই ক্যালকুলাস-গুলোকে পরিষ্কার করিয়ে নিতে হবে। তার ফলে দাঁত বহুদিন পর্যন্ত ভালো থাকবে।

দাঁত ভালো না থাকলে কমফোর্ট, অ্যাস্থেটিক এবং ফাংশন এই তিনটিই ব্যাহত হবে। দাঁত না থাকলে সৌন্দর্য থাকবে না, দাঁত না থাকলে চিবানো যাবে না। ফলে পেটের সমস্যা তৈরি হবে।

আর একটা জিনিস মানুষ যেটা খুব অবহেলা করে সেটা হল ভাঙা দাঁত আছে তবুও তোলায় না। কখনো সুচালো হয়ে জিভে লেগে জিভে ঘা তৈরি হয়। এগুলো সারিয়ে নিতে হয়। যদি মুখের ভেতর কোনো ঘা ১৫ দিনের বেশি থাকে তাহলে মাথায় রাখতে হবে ক্যানসারের কথা। জিভে, গালে বা মাড়িতে সাদা প্যাচ, ব্যথাবিহীন ঘা বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে ভাবতেই হবে ক্যানাসারের কথা। এরকম বহু রোগী আসে এই ধরনের ঘা নিয়ে। কিন্তু কিছুইকরার থাকে না। শুধুমাত্র মেজর অপারেশন করে ঘাটাকে সারবার চেষ্টা করা হয়।

তাই দাঁত থাকতে দাঁতকে মর্যাদা দিতে শিখুন। সুন্দর দাঁত এনে দেবে মুক্তোর মতো হাসি।


সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment