দাদ হাজা চুলকানির মহৌষধ

770 Views 0 Comment
দাদ হাজা চুলকানির মহৌষধ

গ্রীষ্মকালে আবহাওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র থাকায় পরিবেশগত কারণে অসুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার রোগ-জ্বালার সৃষ্টি হয়। বিশেষত ত্বক বা চামড়ার ও পেটের নানা রোগ। এই সময় গরমের কারণে ঘর্মাখ্ত দেহে ত্বক সব সময় ভেজা থাকায়, ধুলো-বালি জমা হওয়ায়, কোনো কারণে ত্বকের ঠিকমতো যত্ন বা পরিচ্ছন্নতা না থাকায়, ঘর্মসিক্ত পোশাক-পরিচ্ছদ বেশক্ষণ কিংবা বার বার ব্যবহারের কারণে ত্বকের রোগগুলি সংক্রমণের সুযোগ পায়। গ্রাম বাংলাই এই সময় ত্বকের রোগে বহু মানুষ খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়েন। অস্বস্তি, জ্বালা , যন্ত্রণা ও অস্বাভাবিক অবস্থায় সবসময়  খুবই কষ্ট হয়।

এই সময় চুলকানি, দাদ-হাজা, খুসকি, ঘামাচি, ছুলি সহ নানান রোগ উপসর্গ এককভাবে কিংবা একাধিক রোগে একসঙ্গে সংক্রামিত হয়।

চুলকানি, দাদ-হাজা-ছুলি, খুসকি নিরাময়ে ভেষজ ব্যবহার

  • দেহের যেকোনো জায়গায় চাক চাক হয়ে দাদের মতো অনেকটা অংশে খুবই চুলকানি হলে আমরুল পাতার রস সারাদিনে অন্তত তিন-চারবার লাগালে দু’তিন দিনেই চুলকানি কমে যায়। আর হয় না। আরও কয়েকদিন লাগালে সম্পূর্ণভাবে সেরে যায়।
  • শিলারস গাছের আঠা বা বাজারজাত শিলারস খোস-প্যাঁচড়া-চুলকানি রোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে শিলারস ভেজানো জল সারাদিনে তিন-চার বার আক্রান্ত স্থানে লাগালে চার-পাচ দিনে রোগটি সেরে যায়। মতান্তরে একই সঙ্গে দিনে দু’বার নিয়মে ৫ গ্রাম শিলারস এক গ্লাস জলের সঙ্গে খেতে ভালো ফল দেয়।
  • অধিক পরিমাণে ঘামাচি হলে, ঘামাচির জ্বালা যন্ত্রণা অধিক হলে, শুষ্ক চামড়ার চুলকানি হলে, ত্বকে অ্যালার্জি ও সঙ্গে চুলকানি হলে কাকমাছি পাতার রস ১ চামচ পরিমাণে নিয়ে এক গ্লাস জলের সঙ্গে সকালে খালি পেটে দু’তিন দিন নিয়মিতভাবে খেলে খুবই উপকার হয়। একই সঙ্গে দেহের আক্রান্ত স্থানে পাতার রস লাগালে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়। উপকার বুঝে আরও কয়েকদিন ব্যবহার মতান্তরে কাকমাছি পাতাকে শাকের মতো রান্না করে খেলেও উপকার হয়।
  • সমগ্র কাকজঙঘা গাছ জলে সেদ্ধ করে থৈরি ক্বাথ দিনে দু’তিনবার করে চার-পাচ দিন খেলে ত্বকের সবরকম রোগে উপকার হয়।
  • যেকোনো সাধারণ পুরাতন কিংবা নতুন চুলকানি রোগে বাজারজাত বড় এলাচ (ফলের বীজ) ভালো করে বটে দেহের আক্রান্ত স্থানে চন্দনের মতো প্রলেপ দিয়ে (সারাদিনে তিন-চার বার) অন্তত এক ঘন্টা রেখে পরে ধুলে দু’তিন দিনেই চুলকানি কমে যায়। অবস্থা বা উপকার বুঝে আরও কয়েকদিন লাগানো যায়।
  • শিয়ালকাটা গাছের মূল যেমন উপকারী  তেমনি এর বীজ থেকে তেরি তেল (সমপরিমাণ সরষের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে) আক্রান্ত স্থানে দিনে চার-পাচ বার লাগালে তিন-চার দিনে খোস-প্যাচড়া –চুলকানি দ্রুত সেরে যায়।
  • দেহে রক্তঘটিত কোনো কারণে চুলকানি হলে ৫-৭ গ্রাম তেজপাতা কুচি কুচি করে কেটে ৪-৫ কাপ জলে কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে সেই জল সারা দিনে তিন-চার বার নিয়মে চার-পাচ দিন খেলে রোগ উপশম হয়। অনেকে একই সঙ্গে তেজপাতা সেদ্ধ জলে চান করার কথাও বলেন।
  • সেগুন গাছ কাষ্ঠপ্রদায়ী গাছ হলেও এই গাছের বীজ থেকে তৈরি সেগুন তেল যেকোনো বয়সের মানুষের সব রকম চুলকানি, খোস-প্যাঁচড়া রোগে ভালো কাজ করে। দিনে চার-পাঁচ বার এই তেল আক্রান্ত স্থানে মাখতে হবে তিন-চার দিন অন্তর।
  • সব বয়সের যেকোনো মানুষের সবরকম চুলকানি রোগে চিরতা ভালো কাজ করে। ঘানির সরষের তেল (১০০ গ্রামে ২০-২৫ গ্রাম) চিরতা সহ গাছ সেদ্ধ করে পাওয়া তেল দিনে চার-পাঁচ বার আক্রান্ত স্থানে ভালো করে মাখলে তিন-চার দিনে সে পুরাতন হোক কিংবা নতুন হোক রোগটি সেরে যায়। প্রয়োজনে আরও কয়েকদিন লাগাতে হতে পারে।
  • কারিপাতা গাছের কাচা পাতা ফুসকুড়ি-চুলকানি রোগে ভালো কাজ করে। পাতা বাটা আক্রান্ত স্থানে দিনে দু’তিনবার লাগাতে হবে তিন-চার দিন।
  • ঘোরসান তন্ত্তপ্রদায় গাছ হলেও মানুষের ত্বকের রোগ যথা চুলকানি, ছুলি, খোস-প্যাচড়া প্রভৃতি রোগে খুব ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে ১ লিটার জলে ১০০ গ্রাম মতো শণ বা ঘোরসান ডাটা সহ পাতা ছেঁচে তৈরি মিশ্রণ দিনে অন্তত চার-পাঁচ বার আক্রান্ত স্থানে লাগালে তিন-চার দিনে রোগটি সেরে যায়। প্রয়োজনে আরও কয়েকদিন লাগাতে হতে পারে।
  • মহানিম বা ঘোড়ানিম সবরকম  শুষ্ক চুলকানি রোগে ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে তাজা নিম ফুল কিংবা পাতা বেটে দিনে তিন-চার বার আক্রান্ত স্থানে লাগালে তিন-চার দিনে সব উপসর্গ চলে যায়।
  • শাল গাছ কাষ্টপ্রদায়ী গাছ হলেও ভেষজ গুণাগুণে কম যায় না। সারা গায়ের চুলকানি রোগের ক্ষেত্রে ১০-১৫ টি তাজা কাচা শালপাতা ১ লিটার জলে ভালো করে সেদ্ধ করে সেই জলে সারা দিনে অন্তত চার-পাঁচ বার আক্রান্ত স্থানে ধুলে চার-পাচ দিনে রোগটি সমূলে অপসারিত হয়।
  • শ্বেত হুড়হুড়ি গাছের পাতার রস মুনুষের সরকমরে চুলকানি রোগে ভালো কাজ করে। স্নানের অন্তত আধ ঘন্টা আগে পাতার রস আক্রান্ত অঙ্গে মাখতে হবে। তিন-চার দিনে রোগ সেরে যায়।
  • নাগদোনা বা নাগদমনী গাছের পাতার রস দাদ-চুলকানি-ছুলি রোগে ভালো কাজ করে। পাতার রস আক্রান্ত স্থানে দিনে তিন-চার বার নিয়মে তিন-চার দিনে লাগাতে হবে। রোগটি সম্পূর্ণভাবে সেরে যায়।
  • সব ধরনের চুলকানি রোগের ক্ষেত্রে কালোজিরার তেল (১০০ গ্রাম সরষের তেলের সঙ্গে ৫০ গ্রাম কালো জিরা ভালো করে সেদ্ধ করে) দিনে তিন-চার বার নিয়মিতভাবে লাগালে চার-পাঁচ দিনে রোগটি সম্পূর্ণভাবে চলে যায়।
  • অগুরু গাছের বাজারজাত কাঠ যেকোনো প্রকার চুলকানি রোগ ভালো কাজ করে। কাঠ অংশকে ভালো করে চন্দনের মতো করে বেটে বা ঘষে আক্রান্ত স্থানে দিনে তিন-চার বার অন্তত লাগাতে হবে। চার-পাচ দিনে রোগটি সম্পূর্ণভাবে সেরে যায়।
  • বনলেবু বা পোতালি গাছের কান্ড, পাতা মূল সবই খুব উপকারি হলেও মানুষের চুলকানি রোগে ২৫ গ্রাম মতো তাজা মূল ভালো করে সেদ্ধ করে সেই দিনে চার-পাচ বার নিয়মে চার-পাচ দিন মাখলে রোগটি সমূলে চলে যায়।
  • সব বয়সের সব মানুষের দেহে রক্তদূষণজনিত সবরকম চুলকানি রোগে মুচকুন্দ গাছের ছাল ৫ গ্রাম মতো নিয়ে ৩ কাপ জলে বেশ কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে পাওয়া ক্বাথ দিনে তিন-চার বার নিয়মিতভাবে তিন-চার দিন খেলে রোগটি ধীরে ধীরে সেরে যায়।
  • পিত্তজনিত চুলকানি রোগে সারা গায়ে জ্বালা যন্ত্রণা দেখা দিলে ৫ গ্রাম বরুণ ছাল ৫ গ্রাম গোক্ষুর বীজ একসঙেবগ ভালো করে ছেঁচে ৩ কাপ জলে ভালো করে সেদ্ধ করে তৈরি ক্বাথ সকালে খালিপেটে চার-পাচ দিন খেলে রোগটি দ্রুত সেরে যায়।
  • দাদ, চুলকানি, খুসকি রোগে আক্রান্ত স্থানে সজিনা বা নাজনা মূলের ছাল বেটে তৈরি রস দিনে দু’তিনবার লাগালে দু’ তিনদিনে রোগটি সেরে যায়। খুসকির ক্ষেত্রে সজিনা পাতার রস মাথায় মেখে আধঘন্টা পরে স্নান করলে চার-পাচ দিনে রোগটি সেরে যায়।
  • বাজার থেকে সংগৃহীত রক্তচন্দন কাঠ ঘষে পাওয়া লেইটি দিনে তিন-চার আর আক্রান্ত স্থানে লাগালে চার-পাচ দিনে রোগটি সেরে যায়।
  • পুরাতন দাদ-হাজা ও ছুলিতে আক্রান্ত স্থানে ওল (কন্দ) পোড়া দিনে দু-তিন বার নিয়মে তিন-চার দিন লাগালে রোগের উপশম হয়।
  • পুরাতন দাদ কিংবা চাপড়া চুলকানি রোগে, হাজা রোগে পান পাতার রস দিনে দু’ তিনবার নিয়মে চার-পাচদিন লাগালে উপকার পাওয়া যায়।
  • দাদ,হাজা ও ছুলি রোগে চকবড় বা চাকুন্দা গাছের বীজ জলে বেটে সামান্য উষ্ণ করে দিনে দু’তিনবার নিয়মে চার-পাঁচ দিন লাগালে ধীরে ধীরে রোগের উপশম হয়।
  • গ্রাম বংলায় নারকেল মালা পুড়িয়ে তার সঙ্গে সামান্য নারকেল তেল মিশিয়ে তৈরি পেস্ট আক্রান্ত স্থানে দিনে তিন-চার বার লাগানো হয়। কয়েকদিনের মধ্যে দাদ সেরে যায়।
  • চুলকানি ও গায়ে ছোপ ছোপ দাগের কারণ যদি রক্তদুষ্টি হয় তবে এক মুঠো নিম পাতা এক লিটার জলে ভালোভাবে সেদ্ধ করে ওই জল ছেকে সারাদিনে সাত-আটবার করে খেলে দু’-তিন দিনে উপকার পাওয়া যায়।
  • কয়েকদিন নিয়মিতভাবে ভাতের সঙ্গে দু’তিন কোয়া রসুন খেলে দেহের সবরকম চর্মরোগ দ্রুত নিরাময় হয়। গ্রীষ্মকালীন ফোড়া প্রতিরোধ ও নিরাময় এবং দ্রুত ফেটে যায়। দেহের ত্বক স্বাভাবিক হয়।
  • ১ চামচ নিশিন্দা পাতার রসের সঙ্গে ৩-৪ গ্রাম আন্দাজ হরিতকী ফল গুড়ো মিশিয়ে দিনে অন্তত দু’বার করে খেলে কয়েকদিনের মধ্যে চর্মরোগটি দূর হয়।
  • জীবাণুর কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে ত্বকের রোগ হলে কাচা হলুদ ও দুর্বা বেটে সেই স্থানে লাগালে ভালো ফল দেয়।
  • গ্রীষ্ম চর্মরুক্ষমতা রোগে অশোক বীজ বেটে গায়ে মাখলে তিন-চার দিন পরে ত্বক স্বাভাবিক হয়ে যায়। রুক্ষতা চলে যায়। গ্রীষ্মে ত্বকীয় রোগের কারণে গাত্রজ্বালা রোগে ২০-২৫ গ্রাম অশোক ছাল ৪-৫ কাপ জলে সেদ্ধ করে তৈরি ক্বাথ জলের সঙ্গে মিশিয়ে স্নান করলে পাচ-ছ’দিন পর রোগটি সর্ম্পর্ণ সেরে যায়।
  • নিসিন্দা ছালের রসের সঙ্গে তিল তেল মিশিয়ে তৈরি নিসিন্দা তেল চার-পাচ দিন আক্রান্ত স্থানে নিয়মিতভাবে মাখলে দেহের সব রকম চুলকানি রোগ সেরে যায়। তাছাড়া পাতার রস মাথায় মাখলে মাথার খুসকি চার-পাচ দিনে চলে যায়।
  • চিঙ্গিা গাছের ডাটা ও পাতা একসঙ্গে ছেচে পাওয়া রসের সঙ্গে সম পরিমাণ জল মিশিয়ে ২-৩ চামচ দিনে দু’বার নিয়মে তিন-চার দিন খেলে খুব তাড়াতাড়ি সবরকম গ্রীষ্মকালীন চর্মরোগ সেরে যায়।

চর্মরোগ নিরাময়ে আরও কতকগুলি উপকারী ভেষজ

গরুঢ়চাপা, কেমূক, পনস, ঘন্টাকর্ণ, সিন্দুবার, অবগ্লুঞ্জ, চন্দ্রশূর, মলপূ, কুম্ভিকা, পারীশ, পুষ্কর, পদ্মক, ক্ষীরিণী, শোভাঞ্জন প্রভৃতি।

বিশেষ পরামর্শ

বিশেষত চুলকানি রোগে যে কোনো ভেষজ নিয়মিতভাবে খেলে বহিঃ প্রয়োগ অপেক্ষা ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে একটু বেশি সময় লাগলেও রোগটি সমূলে নিরাময় হয়। উল্লেখ্য, তালিকাবদ্ধ ভেষজগুলির মধ্যে যেটি হাতের কাছে পাওয়া যায় সেটিই নিয়মিতভাবে ব্যবহার করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন স্থায়ী ফল পাওয়া যায়। চেনা-জানা বা পরিচিত ভেষজগুলিই ব্যবহার করা উচিত।


সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment