দেখতে অসুবিধা? চোখের দোষ নাও হতে পারে

1005 Views 0 Comment
দেখতে অসুবিধা চোখের দোষ নাও হতে পারে

মস্তিষ্কের এক একটি লোবের এক এক ধরনের কাজ আছে। যেমন ফ্রন্টাল লোবের প্রিফ্রন্টাল ও প্রিসেন্ট্রাল কর্টেক্স মূলত মোটর, প্যারিয়েটাল, টেম্পোরাল ও অক্সিপিটাল মূলত সেন্সরি এবং লিম্বিক লোব মূলত রাসায়নিক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিটি লোবের কোষদেহ কেন্দ্রীয় নির্দেশ নিয়ে মোটর স্নায়ুতন্তুর পথ ধরে মস্তিষ্কের বিভিন্ন রিলে স্টেশন টাচ করে ইন্টারনাল ক্যাপসুল ও ব্রেনস্টেম দিয়ে মেডালাতে পৌঁছয়।

সেখানে এক অর্ধের তন্তু ক্রশ করে দেহের বিপরীত দিকে স্পাইনাল কর্ডের সামনের সারির কোষের সামনে এবং সাইনাপসের সম্মুখে শেষ হয়। কিছু তন্তু মেডালাতে ক্রশ না করে সরাসরি নীচে নামতে পারে। স্পা নাল কর্ডের সাইনাপসের ওপরের সারির স্নায়ুতন্তুকে আপার মোটার নিউরন বলে। নীচের সারির নিউরোন তথা স্নায়ুতন্তুদের লোয়ার মোটর নিউরোন বলা হয়। ডাক্তারবাবুরা সংক্ষেপে এদের যথাক্রমে ‘ইউ.এম.এন’ ও ‘এল.এম.এন’ নামে চিহ্নিত করেন। ইন্টারনাল ক্যাপসুলের স্তরে মানুষের পিরামিড পথের ক্ষতি হলে ইউ.এম.এন-এর নির্দেশ স্পাইনাল কর্ড হয়ে হাতে-পায়ে পৌঁছতে পারে না। শক পেয়ে প্রথমে হাত-পা লুলো হয়ে পড়ে। হাত-পায়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শক দশা কেটে যাওয়া মাত্র মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। কনুই, হাঁটু, গোড়ালি ও আঙুলগুলো ভাঁজ হয়ে দেহের সঙ্গে সেঁটে থাকতে চায়। তাদের টেনে সোজা করাও মুশকিল হয়। নীচের সারির নিউরোন তথা এল.এম.এন অসুস্থ হলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শিতিল হয় ও সরু হতে থাকে।

সেনসরি তথা অনুভূতি গ্রহণকারি নিউরোনগুলো শরীরের বিভিন্ন প্রান্তের অনুভূতি গ্রহণ করে স্পাইনাল কর্ডের পিছনের দিকের দরজা দিয়ে ঢুকে সাইন্যাপস তৈরি শুরু হয়, তারা মেডালাতে গিয়ে রাস্তা ক্রশ করে ব্রেনস্টেম হয়ে ওপরে ওঠে। স্ট্রোক হয়ে ব্রেনস্টেমের ক্ষতি হলে দেহেরে উল্টোদিকের সব ধরনের অনুভূতি লোপ পায়। স্পাইনোথ্যালামিক পথের সেনসরি স্নায়ু থ্যালামাসে গিয়ে শেষ হয়। সেখান থেকে ইন্টারন্যাল ক্যাপসুলের মধ্যে দিয়ে কর্ট্রেক্স পৌঁছয়। কাজেই কর্টেক্স ড্যামেজ হলে বিপরীত দিকের প্রায় সব ধরনের অনুভূতি আক্রান্ত হয়। প্যারিয়েটাল কর্টেক্সে বড় মাপের স্ট্রোক হলে অনুভূতি এতটাই কমে যায় যে রোগী বুঝতেই পারে না তার হাত-পা শরীরের সঙ্গে যুক্ত আছে কি না।

স্ট্রোক হয়ে দেহের এক অর্ধ অসাড় হলে, গন্ধ বুঝতে না পারলে, পায়খানা-প্রস্রাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে, কারও সঙ্গে কথা বলার মুডে না থাকলে ও আবেগপ্রবণ হলে অসুখের শেকড় ফ্রন্টাল লোবে আছে ধরে নেওয়া যেতে পারে। একপাশ কমজোরি হওয়ার পাশাপাশি মামুলি যোগ-বিয়োগ করতে না পারলে, ভাষা বুঝতে সমস্যা হলে ও গিলতে অসুবিধে হলে ডমিনেন্ট প্যারাইটাল লোব, কথা বলা বন্ধ হলে, ভূলভাল শব্দ কানে এলে, ঠাকুর-দেবতা বা ভূত-প্রেতদের দেখতে পাচ্ছেন এমন অনুভূতি হলে ডমিনেন্ট টেম্পোরাল লোব আক্রান্ত হয়েছে ভাবতে পারেন। দৃষ্টি ঝাপসা হলে, আঁকাবাঁকা রেখা চোখের সামনে ভাসলে বা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেলে অক্সিপিটাল লোব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

স্ট্রোক রহস্যের পর্দা এবার নিশ্চয়ই সাধারণ লোকেদের সামনেও ফাঁস হতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের জন্য হাত-পা কমজোরি হলে সাময়িক স্ট্রোক তথা টি.আই.এ, অবনতি চলতে থাকলে ইভলভিং স্ট্রোক, রোগ-লক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে কমপ্লিটেড স্ট্রোক, ঝড়ের বেগে স্ট্রোক লক্ষণ হাজির হলে হিমোরেজিক স্ট্রোক, ধীরে ধীরে রোগ-লক্ষণ প্রকাশ পেলে ইস্কেমিক স্ট্রোক, হাত-পা লুলো হলে লোয়ার মোটর নিউরোন ও হাত-পা শক্ত কাঠ হয়ে গেলে আপার মোটর নিউরোন আক্রান্ত হয়েছে বুঝতে আর অসুবিধে রইল না।

ডাক্তারবাবুরা আবার স্রেফ অ্যানাটমিক্যাল জ্ঞানের জোরে শুধুমাত্র রোগ-লক্ষণ দেখে মস্তিষ্কের গভীরে কোন ধমনীতে রক্তের টুকরো জমে যাচ্ছে বা আটকে পড়ে ব্লকেজ হচ্ছে তা সহজেই অনুমান করতে পারেন। যদি হঠাৎ করে কোনো রোগীর শরীরের একপাশ কমজোরি হতে থাকে, যদি হাত-পা নড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায় ও চোখে দেখতে অসুবিধে হয় তবে বিচক্ষণ চিকিৎসক বুঝে যায় যে এম.সি.এ তথা মিডিল সেরিব্রাল আর্টারি চত্বরে ব্লকেজ হচ্ছে বা হয়েছে। যদি শুধুমাত্র হাত-পা ও বাহু কমজোরি হয় তবে ডাক্তারবাবুরা অনুমান করে নেন যে ব্লকেজ হয়েছে মিডিল সেরিব্রাল ধমনীর কোনো একটি শাখাতে। আবার যদি শুধুমাত্র কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ধারণা হয় যে এম.সি.এ-এর নীচের দিকের শাখাতে ব্লকেজ আছে। হঠাৎ করে কোনো রোগীর স্ট্রোক হয়েচোখরে পাতা ভারি হয়ে এল, সে চোখের পাতা তুলতে না পারলে বেজিলার ধমনীর ওপর অংশ ব্লকেজ আছে বলেই ডাক্তারবাবুরা বুঝে নেন।

স্ট্রোক রহস্য বুঝে ফেলা সবসময় সহজ নাও হতে পারে। কারণ, ক্ষতস্থান থেকে একটি নিউরোন সরাসরি তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এমন স্থানে পৌঁছয় না। আরও কতকগুলো স্নায়ুর সাথে একজোট হয়ে এবং রিলে স্টেশন স্পর্শ করে তাকে নীচে নামতে হয়। আবার শুধু নিউরোন কেন, একটি রক্তবাহীনালী একাধিক স্নায়ুকে রক্ত সরবরাহ করতে পারে। কাজেই শুধুমাত্র একটি দুটি রোগ-লক্ষণ নিয়ে স্ট্রোক প্রকাশিত না হয়ে অনেকগুলো লক্ষণের সমাহার নিয়েও হাজির হতে পারে। যে অংশের কোনো ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি সে অংশটির স্নায়ুতন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে একই পথে যাত্রা করার সুবাদে অনেক ভুলভাল রোগ-লক্ষণ দেখিয়ে চিকিৎসককে বিভ্রান্ত করতে পারে। সেজন্য আজকাল স্ট্রোক সিন্ড্রোম কথাটি বেশি ব্যবহৃত হয়। যেমন মেডালারি সিন্ড্রোম, পন্টাইন সিন্ড্রোম ইত্যাদি।

চিকিৎসকের শুধুমাত্র অনুমান করে ট্রিটমেন্ট করেন না। তারা রোগীকে পরীক্ষা করেও অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন। তথ্য সংগ্রহ করেন রোগী ও রোগীর আত্মীয়ের মুখে শোনা কথা থেকে। যেমন কোনো রোগীর হৃদরোগ থাকলে, রিউম্যাটিক ক্ষত থাকলে, বেশি রক্তচাপ থাকলে, কপাপিকায় জমে যাওয়া রক্তের টুকরো ছিঁড়ে কার্ডিওএমবোলিক স্ট্রোক বাধাতে পারে। কাজেই স্টেথোস্কোপ বসিয়ে হৃদযন্ত্রের গোলাযোগ দেখে ও রোগের ইতিহাস এবং রোগ-লক্ষণ মিলিয়েও ডাক্তারবাবুরা স্ট্রোক রোগের উৎসের সন্ধান করতে পারেন। তার ওপর উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে নানারকম উন্নত প্যাথোলজিক্যাল ও ইমেজিং টেকনোলজির দৌলতে অনুমান যাচাই করে তার কনফার্মড ডায়াগনোসিস করতে পারেন। তবুও দুর্ভাগ্য এটাই যে এতকিছু করেও চিকিৎসাবিজ্ঞান ৩০ %-এর বেশি ক্ষেত্রে স্ট্রোক রহস্যের ঘোমটা তুলতে ব্যর্থ হয়। চিকিৎসকেরা মচকাবেন তবুও ভাঙতে নারাজ। এই ধরনের স্ট্রোক রোগের বেলায় ডায়াহনোসিসের ঘরে তারা লুকোনো স্ট্রোক তথা ক্যারিপ্টোজেনিক স্ট্রোক লিখে জ্ঞানের নমুনা প্রদর্শন করেন।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment