প্রজনন প্রক্রিয়ার উপর ক্রোমোজোমের খবরদারি

34 Views 0 Comment

জিনের কাজ

 জিনের কাজ হচ্ছে আর.এন.এ উৎপাদন করা । আমাদের শরীরে নানা ধরনের আর.এন.এ আছে যেগুলো নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করতে ওস্তাদ । একটি জিন হচ্ছে একটি ডি.এন.এ ইউনিট ’ এবং প্রতিটি জিন আলাদা আলাদা প্রোটিন তৈরি করার ক্ষমতা ধরে । একটু এদিক ওদিক হলেই আর রক্ষে নেই । সেই লোকটি ওই বিশেষ প্রোটিন তৈরি হতে চিরতরে বঞ্চিত হবে । তাতে করে নানা রোগ – ব্যাধির প্রবণতাবাড়ে । এখন জিন বিশেষজ্ঞরা অনেক রোগ , যেগুলোর কারণ দু – তিন দশক আগেও অজানা ছিল , এখন জিনের দোষ বলে জোর দিয়ে চিহ্নিত করতে সমর্থ হয়েছে ।

নানা জিনের নানা কাজ

মলিকিউলার বায়োলজি নিয়ে গবেষণার পরিসর যতই বাড়ছে , ততই নানা জিনের কার্যকারিতার পরিধি ও তাদের সীমাবদ্ধতার কথা জানা যাচ্ছে । পারতপক্ষে দুই ধরনের ক্রোমোজোমই ( অটোজোম ও সেক্স ক্রোমোজোম ) যদি স্বাভাবিক হয় তাহলে তারা মিলেজুলে নানা বয়সের মানসিক , ব্যবহারিক , শারীরিক ও অন্য সব নানা ক্রিয়াকলাপগুলোকে সুষ্ঠ ছন্দে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয় । আর সেজন্য নানা স্ত্রীরোগ বিশেষত প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেলে শুধু সেক্স ক্রোমোজোমের দুর্বলতা আছে এরূপ ভেবে নেওয়া ঠিক নয় । যদি বন্ধ্যাত্বের অন্য কোনো কারণ না মেলে তাহলে তার সাথে অটোজোমের ত্রুটিজনিত কারণে সন্তানহীনতা হচ্ছে কি না তাও জেনে নিতে হবে । শুধু চিহ্নিতকরণই নয় , তারা জিন থেরাপিও শুরু করে দিয়েছেন । এসবনা জেনে এখন আর উপায় নেই ।

কী দিয়ে তৈরি ডি.এন.এ

ডি.এন.এর কাঠামোটা হচ্ছে এক ধরনের শর্করা দিয়ে তৈরি যার নাম deoxy-ribose শর্করা । বহুতল বাড়ির সিঁড়ির দুদিকে ফ্ল্যাট থাকলে মাঝে অবস্থিত একটি সিঁড়ির যেমন দু দিকে দুটি ‘ বার ’ থাকে , অনুরূপভাবে একটি ডি.এন.এ – র দু ’ দিকে দুটি শর্করার বার আছে । সমান্তরালভাবে । সেই জন্য ডি.এন.এ – এর গঠনশৈলীকে ‘ double stranded ’ বলে । আর মাঝখানে প্রোথিত থাকে চার শ্রেণীর ‘ নিউক্লিয়িক অ্যাসিড বেস ’ । যেমন অ্যাডিনিন (A ) , গুয়ানিন (G ) , থাইমিন (T ) ও সাইটোসিন (C ) ।

জিন নিয়ে আরও খবর

প্রতিটি ক্রোমোজোমে কয়েক হাজার জিন । অবস্থান করে এবং প্রতিটি জিন এক নির্দিষ্ট ।কাজের জন্য সদাসর্বদা তৈরি । উদাহরণস্বরূপ একটি মানুষের চুলের রং , নখের আদল , তার উচ্চতা , গায়ের রং , চোখের মণি — এ সবের প্রতিটির জন্য এক বিশেষ জিনের ওপর দায় দায়িত্ব বর্তায় ।

জিনের অবস্থানগত অদলবদলে বন্ধ্যাত্ব

বিজ্ঞানীরা জেনেছেন যে মানুষের শরীরে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার জিন আছে এবং মানব শরীরে এই কয়টি জিন প্রায় ১ লাখ প্রজাতির ‘ প্রোটিন ’ ও ‘ উৎসেচক ’ তৈরি করতে সমর্থ । বুঝুন ব্যাপারটা । আগে থেকেই নির্ধারিত সেই স্থানটিকে বলে ওই জিনের ‘ Loci ‘ । অর্থাৎ আপনি যদি রমেশবাবুকেই চান তাহলে রমেশবাবুর হাউস নম্বরে গিয়ে খোঁজ করতে হবে । উপেনবাবুর বাড়িতে কড়া নেড়ে রমেশ ’ কই বললে হবেনা । কয়েক বছর আগেও খোদ কিছু রোগের বা উপসর্গের কোনো হদিশ পাওয়া যেত না বলে ডাক্তারবাবুরা হাত তুলে দিতেন ( ইডিওপ্যাথিক কজ ) , কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভাক্তারবাবুরা এই কথা আওড়ালে জনগণ মেনে নেবেন কেন ? জিন বিষয়ক বিজ্ঞান নিয়ে এখন মানতেই হবে । এমনই জনপ্রিয় হয়েছে জিন থেরাপি ।

কখন নেমে আসে বিপর্যয়ের খাড়া

দুই ধরনের গ্যামেট অর্থাৎ শুক্রাণু ডিম্বাণুর তৈরির প্রক্রিয়ার সময় ( মিওসিস অথবা পরবর্তীকালে যখন দুটি বিপরীত লিঙ্গে র গ্যামেট মিলন হচ্ছে তখন যদি স্বামী বা স্ত্রী ক্রোমোজোমগুলি একাত্ম হয় তখন এমন তো হতেই পারে যে একটি বিশেষ জিন ভুলবশত নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় না গিয়ে অন্য ক্রোমোজোমে ভুল ঠিকানায় চলে গেল । এরকমটা হলে পরবর্তী প্রজন্মের সন্তান – সন্ততির বন্ধ্যাত্বের সমস্যা হতেই পারে । তাতে তিনি পুরুষই হোন আর মহিলাই হোন । এখানেই আন – এক্সপ্লেনড় বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে ক্রোমোজোম পরীক্ষার প্রয়ােজন । আমরা আগেই জেনেছি যে জিনের অবস্থানগত পরিবর্তন হলে সেই জিনটি তার স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সমর্থ না হবারই তো কথা । ফলে উৎপাদিত ভ্রণটিরও ক্ষতি হবে ।

এরকমটা হলে অনেক ক্ষেত্রেই ( সব ক্ষেত্রে নয় ) ভ্রণটি হয় গর্ভেই বিনষ্ট হয়ে যাবে(নিজ হতে গর্ভপাত) নতুবা শিশুটি বড় হয়ে কিছু  বিশেষ রোগে ভুগবে , যা দেখে ডাক্তারবাবুরা বা ক্লিনিক্যাল জেনেটিস্টরা ( যারা জিনঘটিত রোগ নির্ণয়ে পারদর্শী ) কোন জিনের ত্রুটির জন্য ভুগছে তা নির্ণয় করতে সমর্থ হবেন । এইরূপ রোগের সমস্যা গুণতিতে শত – শত আছে বিজ্ঞানের প্রভূত অগ্রগতির যুগে এখন তো এসব বিষয়ে  জিন মিউটেশন বা জেনেটিক ডিজিজ অস্বীকার করার জো নেই ।

কোনো একজন সুস্থ ব্যক্তির শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর গঠন প্রক্রিয়ার সময়কালে বা গর্ভে নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার সময় ক্রোমোজোমের সংখ্যার বা জিনের অবস্থানগত ত্রুটি নতুন করে হতেই পারে । তাহলে সন্তানহীনতা হবার সম্ভাবন প্রবল । নানা রোগ ব্যাধিতে , পরিবেশ দূষণের কুফল হিসাবে বা নানা সংক্রমণের পরিণামে অন্ডকোষে পুং – জননকোষ ( শুক্রাণু ) তৈরি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতেই পারে । এরকমটা হলে যেমন নতুন তৈরি হওয়া শুক্রাণুগুলির ক্রোমোজোমের সংখ্যার আঙ্গিকে কম – বেশি হতে পারে , তেমনি শুক্রাণুর মধ্যে জিনের অবস্থানগত তারতম্যও হতে পারে । এরকমটা হলে সেই পুং – গ্যামেট ( শুক্রাণু ) হয় সুস্থ ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে অসমর্থ হবে বা নিষিক্ত করলেও তা নিম্নমানের জ্বণ উৎপাদন করে দম্পতিটিকে সন্তানহীনতার দিকে ঠেলে দেবে । দম্পতিরা এমনকী নিষ্ঠাবান বিজ্ঞ চিকিৎসকও টের পেলেন না কেন একটিদম্পতির বারে বারে গর্ভস্থ ভ্রণ নষ্ট হয়ে চলেছে । বা পেটেই সন্তান মারা যাচ্ছে । আর এই ঘটনা অহরহ হয়ে চলেছে শুধু জিন নিয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার জন্য ।

অনুরূপভাবে উপরিবর্ণিত কারণে ( বিশেষত পরিবেশগত কারণে ) ডিম্বাণু তৈরি হবার প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে সেইসব নতুন ডিম্বাণুতে ত্রুটিপূর্ণ । জিন থাকার নিমিত্ত নিম্নমানের গ্যামেট তৈরি হতে পারে ।

ফলত ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের সংখ্যার বা জিনের অবস্থানগত ত্রুটি হতে পারে । এরূপ অসংগঠিত ডিম্বাণু ( জেনেটিক্যালি ইমব্যালেন্স এগ ) যদি দৈবাৎ উচ্চমানের শুক্রাণু দিয়েও নিষিক্ত হয় তাহলেও হয় ডিম্বাণু নিষিক্তই হবে না ( ফেলিওর অফ ফার্টিলাইজেশন ) বা ভ্রণ ঠিকমতো বাড়বে না ।

ফলে সেই দম্পতির সন্তানহীনতার বিপদ নেমে আসবে । অর্থাৎ জিন বা ক্রোমোজোমকে এড়িয়ে প্রজনন প্রক্রিয়া এক পাও এগোনো যাবে না । আর সেজন্যই যে সব দম্পত্রি সন্তানহীনতার কোনো কারণ জানা যাচ্ছে না , বা যাদের বারে বারে গর্ভনাশ হয়ে চলেছে কিংবা পেটে বারবার সন্তান মারা যাচ্ছে অথবা সন্তান প্রসব হবার দু চার মাস পরে কোনো কারণ ছাড়াই মারা যাচ্ছে , তাদের বাবা – মায়েদের জিন পরীক্ষার দাবি দিনকে দিন জোরালো হচ্ছে ।

0 Comments

Leave a Comment