বয়ঃসন্ধিতে ছেলেমেয়েরা বুঁদ হয়ে যেতে পারে ইন্টারনেটে

533 Views 0 Comment

শতাব্ধী ধরে বিতর্ক চলছে—আজও অমীমাংসিত: বয়ঃসন্ধির সংঘাত এড়ানো কি সম্ভব? উদ্বেলিত আবেগের অর্ঘ্য হাতে যে সময়ের প্রকাশ, স্বভাবজাত চেতনার রূপায়নে যার স্বপ্রকাশ, সেক্ষেত্রে প্রশংস ও নিন্দার গন্ডি বাঁধ মানে না, উচ্ছল ও অস্থির বয়ঃসন্ধিতে বিপরীত ‍মুখীন ভাবধারায় আপেক্ষিক আচরণ স্বাক্ষরিত হয়। হরমোনের উপস্থিতিতে যে জৈবিক, রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে তাতেই গোপনে জেগে ওঠে জাদুকর সেরোটোনিন, ডোপামিন ইত্যাদি। যেসব নিউরোট্রান্সমিটারকে নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না, তাকে নিয়ে তৈরি হয় অস্থিরতা। দেখে নেবার, জিতে নেবার ভঙ্গি তাদের আচরণে, নিজেকে জানতে শুরু করে গৌরব বলে, চিরচঞ্চল ঘূর্ণির দাপটে রহস্য তৈরি হয়। উৎসাহ, আবেগ থেকে মুক্তি পাওয়ার দুর্মর আহ্বানে পথ হাতড়ে চলে আমাদের উত্তর পুরুষ অথবা নারী।

মূলত সমস্যা শুরু হয় তখন , যখন অনেক সময় অভিভাবকরা বয়ঃসন্ধির যে সিজস্ব সমস্যা আছে তা বুঝতে চান না, ফলে সন্তানের সঙ্গে তৈরি হয় দূরত্ব, যে সময় সব থেকে বেশি যাদের দরকার তাদের সাথেই গড়ে ওয়ে মানসিক দূরত্ব। জীবন সম্বন্ধে যে কৌতূহল মিটিয়ে দেওয়া দরকার ছিল সেক্ষেত্রে সাংসারিক বা সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে বন্দী করে আরো বেশি মাত্রায় কৌতূহলকে উস্কে দেন। তারা তো থেমে থাকার পাত্র নয়, তারা জানার জন্য অন্যতর পথের অনুসন্ধান করে, যা হয়তো সবসময় সুস্থ পথ নয় বা স্বীকৃত পথ নয়। আচার-আচারণে যে ব্যাপক পরিবর্তন হয় তা কি বাবা-মা অনুধাবন করতে পারছেন? নিষেধের ঘেরাটোপে তাদের জানার ইচ্ছেকে দমিত করে দেননি তো? কতটা ধৈর্য দেখাতে সক্ষম আপনি? পোষাকের আঙ্গিক বদলে যায়, কপালে ভাঁজ পড়ে বাবা-মা’র। কানাঘুষোয় স্থৈর্য হারিয়ে ফেলেন নিজেদের অজান্তে। অকারণ আশঙ্কা অস্থির করে তোলে। তাদের অনুভূতিগুলো এত সত্যি যেন দম বন্ধ হয়ে আসে, শাসন ও স্নেহের সমতা রক্ষা করা হয়তো কঠিন হয়ে পড়ে।

যে সমস্যা মূলত পীড়া দেয়, তা হল—

  • কৌতূহলের বশে ড্রাগ বা অ্যালকোহলে চেখে দেখা।
  • সমবয়সীদের মতো সব চা, আবেগ মুখ্য হয়ে ওঠে, বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা লোপ পায়, হঠকারিতা করে বসে।
  • ভায়োলেন্স ও সাইবার বুলিং-এর শিকার হয়ে ওঠে, পরিত্রাণের পথ না পেলে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
  • মিথ্যে কথা বলে অনবরত, কারোর কারোর মধ্যে ইন্টারনেট ও অনলাইন গেমস প্রীতি বেড়ে ওঠে।
  • খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও পরিবর্তন দেখা দেয়।
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে উপনীত ছেলেমেয়েরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের কবলে পড়ে, অনুকরণপ্রিয় হয়ে ওঠে, সব কথায় ‘না’ দিয়ে শুরু করে, নিষেধ বা বারণকে শুধু অপছন্দ করে তাই নয়, তা আমূল বদলে ফেলতে চায়।

নতুন বাতাসে উতলা তারা। পথ আটকে অনিবার্য প্রাচীরের বাধা হিসাবে বাব-মা, আত্মীয়পরিজন। কারণ তারা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন ও সঞ্চয় করেছেন, অনেক দায়িত্ব তাদের কাঁধে। তবু সংশয় এবং দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা অনেক সময় সঠিক ব্যবহার করতে সক্ষম হয়ে পড়েন। প্রথমেই পরিবেশ অর্থাৎ যে কিশোর বড় হওয়ার দিকে চলেছে তার গৃহ-পরিবেশ, সামাজিক তথা বিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন? পরিবারে বাবা-মায়ের সম্পর্কের বুননটা কেমন?

নিজেদের সম্পর্ক ঠিকঠাক না থাকলে, ছেলেমেয়েরা বিপথে চলে যেতে পারে অনায়াসে। বাবা-মা’র সুদাম্পত্য, সুসম্পর্কের অভাবে কিশোর-কিশোরী একাকিত্বে ভুগতে থাকে, মনোজগতে গভীর ছাপ পড়ে। তা ক্রমশ হতাশা, চাপ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় দিকে চালিত করে। বড়রা শুধু বড় বলে যা ইচ্ছা তাই ব্যবহার করতে পারে না। কিশোরাবস্থা বিদ্রূপের গুরুভার মেনে নিতে পারে না, তাদের মধ্যে অপরিমেয় গ্লানি জন্মায়। অবিমিশ্র নিন্দা অথবা আস্ফালনও তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। প্রত্যাখ্যান, অবহেলা অথবা তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, র্ভৎসনা বা অন্যায় সমালোচনার মধ্যে দিয়ে যারা পার হয় তাদের বিকাশ কখনোই স্বাভাবিক হকে না। ভবিষ্যতে সমাজের বিপক্ষে দাঁড়ানোর, বিদ্রোহের ভাব প্রবল হয়ে উঠতে পারে। প্রতিশোধ স্পৃহা,অবাধ্যতা, প্রতিহিংসা, পলায়নবৃত্থি অথবা নিষ্ঠুরতা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ভয়ে বা চাপে মিথ্যাচারণ করে অথবা নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়। আত্মমূল্যায়নের গ্লানি মিশে ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। বাবা-মায়ের অতিরিক্ত চাহিদার দায় অনেক সময় সন্তানদের নিতে হয়। সন্তানদের ভবিষ্যতের সম্পর্কে চিন্তা গগনচুম্বী, অবাস্তব। আচার-আচরণে স্বার্থ চিন্তা ও মিথ্যার প্রশ্রয় প্রকাশ হয়।

কিশোরমন নৈরাশ্য, দিশাহীনতা ও উদ্বেগের কবলে পড়ে, তৈরি হয় অন্তর্দ্বন্দ ও বিক্ষেপ। নিজেদের না হওয়া সব কিছু সন্তানদের মধ্যে দেখতে চান, ফলে অসম্ভব চাপে জর্জরিত হয়। অতিরিক্ত শাসন ও ভয়, ইঁদুর দৌড়ের সরণিতে তারা, নিয়ম বাঁধা জীবন,আলো বাতাস নেই, নেই দাদুদিদার স্নেহের প্রশ্রয়, নেই ঠাম্মার আচার, নেই খেলার মাঠ, নেই সাথি। আপনারা ছোট থেকে বড় সকলকে কী দিচ্ছেন ভাবুন। ভালোবাসার ঘেরাটোপে বেড়ে উঠলে যে কনফিডেন্স জন্মাত তা আজ হয় না।

বই-খাতার ভারে আক্রান্ত শৈশব তথা কৈশোর শোনে না কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম, পড়ে না ঠাকারমার ঝুলি, গোপাল ভাঁড়, কিন্তু বইমেলায় বেড়াতে যায়। মহাজীবনের মণিকণার কিচু মাত্র তাদের মধ্যে দেন না কেউ। কীভাবে জন্মাবে তাদের বিশ্বাসের জগত? সুপথে চলার দিশা দেখান সন্তানকে, প্রতিযোগিতা আর জেতার তীব্র নেশায় হেরে যাচ্ছেন, সংযত হোন। সন্তানদের সাথে মা-বাবার সম্পর্ক কেমন তা নিয়ে সঠিক পর্যালোচনা করুন।

কৌতূহলের বেশে যা করছে তার জন্যে অতিরিক্ত নিষেধের বেড়া দেবেন না, তাতে আরো বেশি উৎসাহী হয়ে উঠবে। সমাজ স্বীকৃত না হলেও, আপনার চিন্তার সঠিক না হলেও, বোধশক্তি দিয়ে বিচার করুন, আজকের দিনটা কাল থাকবে না। শত অভ্যেস, গঠনগত চিন্তা, সকলের চেষ্টায় আয়ত্তে আসবে, একদিনে নয়। নানান কিছু জানতে চাইলে, যতটা পারেন নিজে বোঝানোর চেষ্টা করুন, বাইরে থেকে বা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন যাতে না করে।

চাহিদা পূরণের দৌড়ে ওদের সামিল না করলেই ভালো। সঠিক প্যারেন্টিং অনেক বেশি প্রয়োজন। তাহলে হয়তো আবেগের অভিঘাতে বিপর্যস্ত হবেন না উভয়পক্ষই। ওদের কথা শুনুন মন দিয়ে, তুচ্ছ করার ভুল না করাই ভালো, নাহলে আত্মগ্লানি ও পতনের অনিবার্যতা স্বাভাবিক ভাবেই আসবে। অনন্ত সম্ভবনা, সেই সম্ভবনাকে বাস্তবে পরিণত করার যে প্রয়াস, সেই সুযোগ তাদের দিতে হবে। শুদ্ধ পথে সম্ভাব্যের বাঞ্ছিত পরিণতি।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment