বয়ঃসন্ধি: যৌন শিক্ষাটা বেশ জরুরি

765 Views 0 Comment

বয়ঃসন্ধি শব্দটির আভিধানিক সংজ্ঞা যাই থাক না কেন আমরা বরং  দেখি চিকিৎসা বিজ্ঞানের চোখে বয়ঃসন্ধির দিকটা।

প্রথাগত সংজ্ঞা অনুযায়ী বয়ঃসন্ধি বলতে বোঝায় জীবনের সেই সময়টাকে যখন মানুষের (পুরুষ বা মহিলা) যৌন লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে (নারী পুরুষ ভেদে শরীরের বিভিন্ন অংশে রোম গজানো যার একটি লক্ষণ)। এবং এই সময়টা চলে সেই সময় পর্যন্ত যতদিন তার শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ না হয়।

এই সংজ্ঞায় একটা অসুবিধা হচ্ছে এই যে নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকার কারণে তা ব্যক্তিবিশেষে সততই পরিবর্তনশীল। সেই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বয়ঃসন্ধির যে সংজ্ঞা দিয়েছে তা হল—শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক উন্নয়নের সময় যা মোটামুটিভাবে ১০ বছর বয়সে শুরু হয় এবং ২০ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। ছেলে মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা একই। অনেকে অবশ্য সময়ের এই ঊর্ধ্বসীমা ১৯ বছরকে ধরেন।

কেন এদের নিয়ে ভাবনা

যেকোনো দেশে যেকোনো সময়ে যেকোনো জনগোষ্ঠিতে জনসংখ্যার একটি বড় অংশই এই বয়সের নাগরিক। ভারতে ১৯৭১ সালে যেখানে মোট জনসংখ্যার ১৯.৫% ছিল বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের, ১৯৮৩-তে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১.৮% এবং ২০০০ সালে তা হয় ২৫%। এই সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অনুপাতে বাড়তে থাকবে। ক্রমহ্রাসমান শিশুমৃত্যুর সংখ্যা, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন এবং উন্নততর স্বাস্থ্য পরিষেবার সদ্ব্যবহার এর কারণ।

কারা প্রভাবিত করে বয়ঃসন্ধির সময়টাকে

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে বালক এবং বালিকা উভয়ের ক্ষেত্রেই সময়সীমাটা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকমের। ঠিক কী কারণে এই পার্থক্য সে কথা পরিষ্কার করে বলা না গেলেও অনুমান করা হয় যে কিছু কিছু কারণ বা ফ্যাক্টর এর পিছনে কাজ করে। যেমন—

  • জন্মগত কারণ—দেখা গেছে একই পরিবারের দুটো সন্তান থাকলে তাদের বৃদ্ধি বা উন্নতি যেমনভাবে হয়, অন্য পরিবারের একই পরিবেশে থাকা অন্যদের সাথে মিলিয়ে দেখলে একটা পার্থক্য দেখা যায়। যেমন বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের মধ্যেই মেয়েরা রজঃস্বলা হয়। এটি সব মহিলার জীবনেই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একই পরিবারের দুই বোনের একই সময়ে এটা শুরু নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান হয় প্রায় এক বছর। এই দুই বোনই যদি আবার সমজাত যমজ (Identical Twin—যেখানে একটি ডিম্বাণু থেকে দুটি সন্তানের জন্ম হয়) সেখানে সময়ের এই ব্যবধান সাধারণত তিন মাসের বেশি হয় না। আবার এরাই যেখানে অসমধর্মী অসমজাত (Non Identical Twin—যেখানে দুটি পৃথক ডিম্বাণু থেকে দু’জনের জন্ম হয়) সেখানে ব্যবধান হয় প্রায় দশ মাস। আবার একই আর্থ-সামাজিক পরিবেশে মানুষ হওয়ার অন্য মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সময়টা কখনো কখনো হয় দেড় থেকে দুই বছর।
  • শৈশব এবং বয়ঃসন্ধির পুষ্টি—একথা বলা হয়ে থাকে যে বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলেমেয়েদের খাদ্যের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এমনকী পূর্ণবয়ষ্ক যারা কায়িক শ্রম করেন, তাদের চেয়েও। সুতরাং এই সময় পুষ্টির ঘাটতি খুব স্বাভাবিক ভাবেই সামগ্রিক উন্নতির প্রভাবিত করে। ঠিক তেমনি শৈশবে যারা অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগেন তাদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম।
  • আবহাওয়াপারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক আবহাওয়া ছেলেমেয়েদের বয়ঃসন্ধিকে প্রভাবিত করে। দেখা গেছে ছেলেমেয়েরা দৈর্ঘ্যে বাড়ে বসন্তকালে এবং ওজন বাড়ে শরৎকালে।
  • শৈশব এবং বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের অসুস্থতা এবং চিকিৎসা—বাচ্চারা এবং বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলেমেয়েরা নানা অসুখে ভুগবে এ অতি সাধারণ ব্যাপার। এ ধরনের স্বল্প সময়ের জন্য সাধারণ কিছু হলে শারীরিক বাড়বৃদ্ধিতে তেমন কোনো সমস্যা বা গ্রোথ রিটার্ডেশন হয় না। কিন্তু যদি দেখা যায় এই সময়ে দীর্ঘদিন কেউ বড় ধরনের অসুখে ভুগছে তবে খুব স্বাভাবিক কারণেই অপুষ্টি ঘটবে এবং তা থেকে সামগ্রিক বৃদ্ধি কম হবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না একেবারেই। আবার শৈশবের এমন অনেক রোগ আছে যাতে উচ্চমাত্রায় স্টেরয়েড ব্যবহার করতে হয় ভালো থাকার জন্য। দীর্ঘদিন এই স্টেরয়েড ব্যবহৃত হলে বৃদ্ধি কম হবার সম্ভাবনা থাকে।
  • মানসিকঅনেকে বলে থাকেন মানসিকভাবে যদি কোনো কিশোর-কিশোরী বিপর্যস্ত থাকে তার স্বাভাবিক বাড়বাড়ন্ত এবং গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়। যদিও ব্যাপারে বিতর্ক অন্যভাবেও ভাবা যেতে পারে।

যদিও কোনো কিশোর-কিশোরীর মানসিক প্রশান্তি না থাকে তবে স্বাভাবিকভাবেই তার খাবার-দাবারের ক্ষেত্রে একটা ঘাটতি দেখা যায়। প্রকারান্তরে তা অপুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঠিক তেমনি প্রযোজ্য পারিবারিক পরিবেশের ক্ষেত্রেও। যে সংসারে দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক অশান্তি থাকে সে সংসার ছেলেমেয়েদের ওপরও একইভাবে প্রভাব পড়ে।

  • ছেলেমেয়েদের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া—বয়ঃসন্ধিতে প্রত্যেকটি কিশোর-কিশোরী যেমন লম্বায় বাড়ে তেমনই ওজনেও বাড়ে। যদিও মনে রাখা প্রয়োজন যে এই বাড় অনেক কারণের ওপর নির্ভরশীল এবং সবার ক্ষেত্রে একই পরিমাণে এবং এক রকমভাবে হয় না। যেমন সাধারণভাবে এই সময়টাতে মেয়েরা ৫.৪ সেন্টিমিটার থেকে ১১.২ সেন্টিমিটার বাড়ে এবং ছেলেরা বাড়ে ৫.৮ সেন্টিমিটার থেকে ১৩.১ সেন্টিমিটার।

কেন এই পরিবর্তন? কে থাকে পিছনে

বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে আমাদের প্রত্যেকের শরীরে যে পরিবর্তন হয় (শারীরিক বা মানসিক) সে এক রহস্যে ঘেরা কাহিনী। যে রহস্যের জাল আজও সম্পূর্ণভাবে খোলা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে চলছে নিরন্তন গবেষণা। তবে এ ব্যাপারে হরমোনের প্রভাব নিয়ে দ্বিমত নেই কারোরই।

হরমোন কী তাহলে?

হরমোন হল শরীরের মধ্যে কার এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা শরীরের বিশেষ বিশেষ কিছু অনালগ্রন্থিতে তৈরি হলেও শরীরের যে অংশে তৈরি হয় সেখানে কাজ না করে রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয়ে শরীরের অন্য অংশে গিয়ে কার্যকরী হয়। সমস্ত হরমোন প্রস্তুতকারী গ্রন্থিগুলো একযোগে কাজ করে মানুষের শরীরের বিপাক, বৃদ্ধি, যৌনবিকাশ, বয়ঃসন্ধি এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রত্যেকটি হরমোন নিজস্ব স্বকীয়তায় আলাদা আলাদা ভাবে নির্দিষ্ট কাজ করলেও পরস্পরের কাজের মধ্যে একটা অদ্ভূত সামঞ্জস্য এবং ছন্দ মেনে চলে। সেই কারণে এই সমস্ত ব্যাপারটাকে অনেকে বলে থাকেন ‘দেহের অর্কেস্ট্রা পার্টি’ এবং মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি এদের মধ্যে আসল এবং নিয়ন্ত্রক গ্রন্থি বলে এই গ্রন্থিটিকে বলে ‘ব্যান্ড মাস্টার’। ব্যান্ডে যেমন কোনো একজন শিল্পী বেসুরো হলে সমস্ত ব্যাপারটাতেই তাল কেটে বিসদৃশ হয়ে যায়, তেমনি এখানেও কোনো একটি হরমোন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে আপন ইচ্ছেতে কাজ করতে থাকলে শরীরের নানা সমস্যা তৈরি হয়। এই পিটুইটারি গ্ল্যান্ড আবার নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের একটা অংশ হাইপোথ্যালামাস দ্বারা।

এখানে মনে রাখা আবশ্যক যে নারী এবং পুরুষ উভয়েরই অনেক হরমোন একই থাকে। কেবল পরিমাণ থাকে ভিন্ন মাত্রায়। নারীদেহে স্ত্রী হরমোনের পরিমাণ এবং প্রাধান্য বেশি নারীত্বের কিছু কিছু লক্ষণ যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি পুরুষ শরীরে স্ত্রী হরমোন অতিরিক্ত হলে উল্টোটা ঘটে। নারী এবং পুরুষের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা শুধুমাত্র একটি হরমোনের ওপরই নির্ভর করে না। উপরন্ত এই দুই শ্রেণীর হরমোনের পারস্পরিক কাজের ওপর নির্ভরশীল।

এ তো গেল শারীরিক পরিবর্তনের গল্পগাঁথা। মানসিকভাবেও বয়ঃসন্ধিকালীন এই সময়টা মানুষের জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ যেখানে কৈশোরের নির্ভাবনায় এবং দায়হীন পরনির্ভর সময়টা ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে। এবং মানুষ বহির্জগত এবং পারিপার্শ্বিক সামাজিক। পরিবেশের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে থাকে। আর্থ-সামাজিক পরিবেশের বাস্তব কাঠিন্য এবং দায়বদ্ধতা স্বাভাবিক কারণেই অনেক সময় একটা চাপ তৈরি হয়। কেউ কেউ জীবনের এই টানাপোড়েন, চাপ, উত্তেজনা খুব স্বাভাবিবকভাবেই মানিয়ে নিতে পারে। আবার কেউ কেউ তা পারে না। ফলস্বরূপ কখনো কখনো অনেকটা এই চাপ নিতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এই সময় ছেলেমেয়েরা খুব আবেগপ্রবণ থাকে। সবকিছুকে সহজ বলে ভেবে নেবার প্রবণতা থাকে। এই আবেগ প্রবণতা অবশ্য ব্যক্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন রকমের হয়। এই আবেগ প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ কখনো ঘটে রাগ অভিমানের মাধ্যমে কখনো বা বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনায়। ফলে কখনো কখনো প্রচলিত চিন্তাভাবনা-ধ্যান ধারণা না মানা বা পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতা যেমন দেখা যায়, আবার কখনো দেখা যায় বিকৃত যৌন আচরণও।

এ সবই যে সবসময় খারাপ ফল এনে দেয় তা কিন্তু নয়। সচরাচর প্রাচীন পন্থীরা মনে করেন (অবশ্যই গোঁড়া প্রাচীনপন্থী) এ সবের সবই বুঝি খারাপ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় কিছু কিছু ব্যাপার আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও সেই অর্থে ঠিক ক্ষতিকারক নয়। যেমন এই বয়সী ছেলেমেয়েদের একটু অন্য ধরনের পোশাক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। আবার কেউ কেউ অকারণে নিজেদের ঘর, বিছানাপত্র অগোছালো করে রাখে। কেউ কেউ আবার বেশ ‘যত্ন করে অযত্নে’ থাকার চেষ্টা করে। এ ব্যাপারে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ইন্টারনেট, ফেসবুক অথবা সিনেমার প্রভাবকে অস্বীকার করা যয় না। তবে এর সবই কিন্তু সেই অর্থে বিপজ্জনক নয় যতক্ষণ তা শালীনতার সীমা ছাড়াচ্ছে। অনেকে পড়াশুনোর ব্যাপার একটু গা-ছাড়া ভাব দেখায়। ফলে পরীক্ষায় ফল খারাপ হয়। অনেকেই এই সময় নানা ধরনের নেশায় আসক্ত হয়, চরি করে, অনেকে নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। কেউ কেই আবার অবাধ যৌনতার শিকার হয়ে যৌনরোগে আক্রান্ত হয় বা অসময়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ের মেয়েরা যারা গর্ভপাত করাতে এসেছে তাদের মধ্যে শতকরা ৮০ জনই জানতই না যে এই ধরনের যৌনমিলনের ফলে গর্ভাসঞ্চার হয়। তাদের ধারণা ছিল যৌনমিলনটা আসলে কেবল শারীরিক বা মানসিক আনন্দ পাওয়ার একটা পদ্ধতি মাত্র।

আমাদের মনে রাখতে হবে (একতরফাভাবে চিন্তা না করে) যে প্রত্যেকের মধ্যেই ভালো এবং মন্দ এই দ্বৈত সত্তা রয়েছে। চেষ্টা করতে হবে যাতে ভালো দিকগুলো প্রকাশ পায়। এ কাজটি যে খুব একটা সহজ তা কিন্তু নয়। কেউ ব্যাপারগুলো দেখলে সে বাবা-মা’ই হোন বা মিক্ষক বা অন্য কেউ হোন, তাকে প্রথমেই উদার মনোভাবাপন্ন হতে হবে এবং নমনীয়, পরিবর্তনশীল হতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে তিনি দুর্বলচেতা হবেন। এ ব্যাপারে যুক্তিহীন হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন—‘আমি বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় বড়,সুতারাং আমি যা বলেছি তা সবই ঠিক এবং ছেলেমেয়েরা যা বলতে চাইছে সবই ভুল—এই মনোভাব ছাড়তে হবে এবং নিজেকে স্বচ্ছ হতে হবে। সমস্যা হলে রাগ দেখিয়ে বা চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলবার প্রবণতা থাকলে তাতে কখনোই সম্যার সমাধান হবে না।

বয়ঃসন্ধিতেই প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ের যৌনচেতনা আসে শারীরিক ও মানসিকভাবে। ফলে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ জন্মায়। কিন্তু ভয়ের এবং মজার কথা এই যে দেখা গেছে অনেক সময় অন্য কোনো ক্ষেত্রে অসাফল্যের কারণে (পড়াশোনা বা অন্য ক্ষেত্রে) হতাশা দূর করতে অনেকেই অবৈধ বা বিকৃতি যৌনচেতনার শিকার হয়। যেমন আসক্ত হয় নানা ধরনের নেশায়। অনেকে আবার একাকীত্ব কাটাবার পথ হিসেবেও এই অবাধ যৌনতা বা বিকৃতি যৌনতার পথ বেছে নেয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সহজলভ্য ভিসিডি, ক্যাসেট, ইন্টারনেট এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে দিন দিন। সেই কারণে প্রাক বিবাহ যৌনসমঙ্গম দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। সেই কারণে বর্তমান পাঠ্যসূচিতে যৌনশিক্ষা বা জীবনশৈলী শিক্ষা একটা অবশ্যপাঠ্য বিষয় হিসেবে নিয়ে আসার পরিবল্পনা চলছে যার মুখ্য উদ্দেশ্য কেবল বিধিবদ্ধ যৌন শিক্ষাই নয় বিজ্ঞানসম্মতভাবে বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদেরে পুরুষ এবং স্ত্রী জননতন্ত্রের গঠন, সন্তান জন্মের রহস্য, জন্ময়িন্ত্রণের ব্যবস্থা, যৌনরোগ (বিশেষত এইডস) এবং তার প্রতিকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা থাকবে। এই সমস্থ বিষয়এতদিন ছিল অনেকটা আড়ালে-আবডালে রাখার বিষয় এবং এ সবের আলোচনা অনেকটা নিষিদ্ধ ফল খাওয়ায় আনন্দের সমতুল্য। ক্রমশ স্কুল-কলেজে এই যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ক খোলোমেলো আলোচনা সুযোগ হয়ে যাওয়ার এখন তা অনেকটাই সহজ হয়েছে। তেমনি সচেতনতা বাড়ার ফলে এ জাতীয় সমস্যাও কমে যাচ্ছে।

যৌন শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে যায়—ঠিক কোন সময়ে বা কোন বয়সে ছেলেমেয়েদের এই শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। এই নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য আছে ঠিকই, তবে সাধারণভাবে বলা হয় যে, যে বয়সে ছেলেমেয়েরা বাইরে বেরোতে শুরু করে সেই সময় থেকেই বয়স অনুযায়ী ধীরে ধীরে তা শুরু করা যেতে পারে। সেদিক থেকে দেখলে ৭-৮ বছর বয়স থেকেই এটা শুরু করা যায়। শিশুদের ওপর ক্রমবর্ধমান যৌন নিপীড়নের প্রবণতা এই বক্তব্যকে সমর্থন করে।

অবশ্য এক্ষেত্রে ‘বয়স অনুযায় যৌন শিক্ষা’ কথাটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ এবং অর্থবহ। প্রাইমারি স্কুল, মাধ্যমিক স্তর, উচ্চ মাধ্যমিক এবং কলেজ স্তরের বিভিন্ন ধাপে স্বাভাবকি ভাবেই শিক্ষার ধরন হবে ভিন্ন রকম। যেমন—প্রাথমিক স্তরে যৌনাঙ্গ, যৌনবিষয়ক সাধারণত বা স্বাভাবিক যৌন চেতনা গড়ে তুললেও স্কুল এবং কলেজ স্তরে যৌন বিষয়ক সচেতনতা ছাড়াও পরিবার পরিকল্পনা, যৌন রোগ, এইডস সম্পর্কে জানানো দরকার যা পরবর্তীকালে বিবাহিত এবং সামাজিক জীবনেও কাজে লাগবে। বুঝতে এবং বোঝাতে হবে যে যৌন সম্পর্ক কেবলমাত্র শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য নয়, এ সম্পর্ক দায়িত্ব এবং দায়ব্ধতারও।

সেই কারণে Sexuality Information & Educatiob Council- US (SIEC-US)- এর মতে যৌনশিক্ষা বা সেক্স এডুকেশন হবে—

  • ছেলেমেয়দের সামগ্রিক শারীরিক এবং মানসিক গঠন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা এবং শারীরবিৃত্তীয় কাজকর্ম বিশেষত প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিতি বিষয়গুলি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া।
  • বন্ধুবান্ধব, পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে, পরিবারের বাইরের অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সম্পর্কের ধরন, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া।
  • বিবাহ এবং বিবাহ সম্পর্কিত ব্যাপার ওয়াকিবহাল করা।
  • জীবনে যৌনতার প্রয়োজন এবং যৌন আচরণ সম্পর্কে জানানো।
  • যৌন স্বাস্থ্য, যৌন রোগ, এইডস, গর্ভপাত সম্পর্কে সামগ্রিক চেতনা দেওয়া।
  • ব্যক্তিগত দক্ষতার মূল্যায়ন এবং তাকে সৃষ্টিধর্মী কাজে লাগানো।

জীবনশৈলী শিক্ষা পাঠক্রমে সংযুক্তি হবে কি হবে না নে বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটিভাবে এভাবেই ঠিক হওয়া উচিত যৌনশিক্ষা বিষয়ক পাঠক্রম—অভিমত বিশেষজ্ঞ মহলের। এবং এ ব্যাপারে মা-মামার ভূমিকা যেমন আছে, তেমনি এগিয়ে আসা উচিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, পারিবারিক চিকিৎসক, প্রশাসক, এমনকী ধর্মীয় নেতাদেরও।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment