মদ্যপানে লিভারের দফারফা

816 Views 0 Comment
মদ্যপানে লিভারের দফারফা

নেশা ! হ্যাঁ, এই নেশা বর্তমান আধুনিক সমাজে এক জীবন্ত অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। সমাজ, সংসার ধ্বংসে হয়ে যাচ্ছে এই নেশার কবলে পড়ে। নেশার টাকা না মেলায় বাবা-মা’কে খুন পর্যন্ত হতে হচ্ছে। নেশাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর অশান্তি, ডিভোর্স হামেশাই চোখে পড়ে। নেশার কবলে পড়ে ছেলেরা স্কুল, কলেজ জীবন নষ্ট করে ফেলছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থ তো চাই। আর সেই প্রয়োজনের তাগিদে অন্ধকার অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে এই বর্তমান প্রজম্মের বহু ছেলেমেয়ে।

নেশার বস্তু হিসেবে সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে মদ, গাঁজা, হোরোইন, ব্রাউন সুগার, কোকেন, ফেনসিডিল-এর মতো নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ, বিভিন্ন রকম পেনকিলার অর্থাৎ ব্যথানাশক ওষুধ। হেরোইন, ব্রাউন সুগার যারা দীর্ঘদিন ব্যবহার করে তাদের এই সমস্যাগুলো দেখা যায়—-যেমন অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ, মানসিক অবসাদ, হতাশা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মাংসপেশির দুর্বলতা, আংশিক প্যারালাইসিস  বা পক্ষাঘাত। রোগপ্রতিরোধ শক্তি ভেঙে পড়ে ক্রমশ। ফলে পরে টিবি, এইডস-এর মতো মারণরোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট, যৌনদুর্বলতা পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ অক্ষমতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাড়ির ইনফ্লামেশন অর্থাৎ প্রদাহ, মুখে দুর্গন্ধ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, আথ্রাইটিস ইত্যাদি দেখা যায়।

যারা মদের নেশায় আক্রান্ত তাদের শরীরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে অর্গানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা হল লিভার বা যকৃত। অ্যালকোহল হেপাটিক সেলকে ভীষণভাবে ড্যামেজ করে। ফ্যাটি লিভার, সিরোসিস অফ লিভার এমনকী লিভার ক্যানাসারেরও অন্যতম কারণ এই মদ। লিভার হচ্ছে মানবশরীরের একটা ভাইটাল অর্গান যা আমাদের শরীরের বায়োকেমিক্যাল ল্যাবরেটরিও বটে। লিভারে বিভিন্ন রকমের এনজাইম তৈরি হয় যেমন পিত্তরস। যা আবার গলব্লাডার এসে জমা হয়। আবার শরীরে বিভিন্নরকমের টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ উ’পাদিত হয় বিভিন্নরকম বিপাকীয় পদ্ধতি বা মেটাবলিজমের মাধ্যমে যা লিভার, কিডনির মাধ্যমে রক্ত থেকে ছেঁকে নিয়ে ইউরিন বা মূত্রের আকারে দেহ থেকে বের করে দেয়।

হার্ট, লিভার,কিডনি শরীরের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তিনটি দিনের পর দিন অনেক অনাচার, অত্যাচার সহ্য করে। সহজে খারাপ হয় না। কিন্তু একবার খারাপ হলে এরাই অবধারিত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পেনকিলার বা ব্যথানশক ওষুধ খেয়ে যারা নেশা করে তাদের মস্তিষ্কের কোষ অর্থাৎ ব্রেন সেল ড্যামেজ হয়ে যায়। ফলে স্মৃতিশক্তি কমে যায় ও কিছু শিখবার ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসে। ভাসকুলার স্টেনোসিস অর্থাৎ রক্তনালী সংকুচিত হবার ফলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

গ্যাস্ট্রিক আলসার হয়। সর্দি, ঠান্ডা প্রায় লেগেই থাকে কারণ রোগপ্রতিরোধ শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। কিডনি ড্যামেজ হয়, মেন্টাল ডিপ্রেশন দেখা দেয়, যৌনক্ষমতা হ্রাস পায়। আবার যেহেতু ভাসকুলার স্টেনোসিস অর্থাৎ রক্তনালী সংকুচিত হয়ে আসে এই পেনকিলার দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশের ফলে, তখন ডিসটাল পার্ট অফ দি বডি যেমন ফিমোরাল আর্টারি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। এর ফলে যে রোগটি তৈরি হয় তার নাম হল ‘অ্যাভাসকুলার নেক্রোসিস অফ দি ফিমার’ অর্থাৎ আমাদের থাই মাসলের ভেতরে ফিমার নামক লম্বা যে হাড়টি রয়েছে তার মাথাটি রক্তের অভাবে ক্ষয় হয়ে যায়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি হিপ জয়েন্টের যন্ত্রণায় প্রভূত কষ্ট পায় আর অবশেষে সার্জারি করে হিপজয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট করতে হয়।

আর খৈনি, গুটখা, গুড়াখু ইত্যাদি থেকে ওরাল কারসিনোমা বা মুখগহ্বরের ক্যানসার হতে দেখা যায়। আমাদের চারপাশে বহু ডি- অ্যাডিকশন সেন্টার বা নেশামুক্তি কেন্দ্র মাসিক প্রদেয় অর্থের বিনিময়ে কাজ করে চলেছে। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি হাতেগোনা দু’একটা ঘটনা ছাড়া যেটা ঘটতে দেখা যায় তা হল যে ক’দিন ওই ব্যক্তি সেন্টারে ছিল ভালোই ছিল, বেশ কয়েক মাস পর সে আপাতসুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল। আর তার ভালো ভালো বন্ধুর (?) সঙ্গে আবার যখন যোগাযোগ, দেখাসাক্ষাৎ হল সে আবার সব ভুলে পুরনো অন্ধকারাচ্ছনান জীবনে ফিরে গেল।

এইরকম ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার বিশেষ ভূমিকা আছে। এই রোগীর ব্যাপারে কাউন্সেলিং করে সম্পূর্ণ পাশ্র্বপ্রতিক্রিয়াহীন ওষুধ নিয়মিত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়ালে নেশাক্রান্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে নেশামুক্ত হয়। এক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াও ওই নেশামুক্ত হয়। এক্ষেত্রে ওষুধ ছাড়াও ওই নেশাক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে বাড়ির বাকি লোকেরা কীরুপ ব্যবহার করবে, কীভাবে না বলে ওষুধ খাওয়াবে, কী কী খাবার খাওয়াবে, আর কী খাওয়াবে না সমস্ত কিছুই খাওয়াবে আপনার চিকিৎসক গাইডলাইন দিয়ে দেবে। আমরা যেমন কম্পিউটারে ফরম্যাট করে সবকিছু মুছে দিয়ে সেটাকে সম্পূর্ণ নতুন করে অবস্থায় পাই তেমনি হোমিওপ্যাথিক  ওষুধ আমাদের ব্রেন ফরম্যাট করে তাকে নেশাগ্রস্ত হবার আগের অবস্থায় নিয়ে আসে। আর নেশার প্রতি একটা ঘৃণা তৈরি করে।

আমরা যখন জন্মগ্রহণ করি তখন কেউ মদ, গাঁজা, হেরোইন মুখে নিয়ে জন্মাই না, আমরা মাতৃদুগ্ধের ওপর জীবন ধারণ করি। কিন্তু কুসংসর্গে পড়েই মানুষ নেশাগ্রস্ত হয়। হোমিওপ্যাথিতে বহু রকম ওষুধ চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়, কিন্তু ব্যক্তিবিশেষে ওষুধ ভিন্ন হবে। আর কোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না। তাতে ফল হিতে বিপরীত হবে। কিছু মেডিসিনের নাম দেওয়া হল, যেমন অ্যাভেনাস্যাটাইভা, প্যাসিফ্লোরা, সিফিলিনাম, ওপিয়াম, সালফার, কফিয়া, ক্যালিফসফোরিকাম, ক্যালডিয়াম সেগুই, স্ট্রফেনথাস, থিয়া ইত্যাদি।


সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment