মানব মস্তিষ্কে বিপজ্জনক পরিবর্তন!

866 Views 0 Comment
মানব মস্তিষ্কে বিপজ্জনক পরিবর্তন!

পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদকে বেঁচে থাকার লড়াই জারি রাখতে হয়। চাহিদা অনুযায়ী চুটিয়ে জীবনের মজা নেওয়ার জন্য জীবের দেহ-মন ও অভ্যাসে অনবরত পরিবর্তন চলছে। জীবের টিকে থাকার অনুকূলে বিকশিত হওয়া পরিবর্তনের পদ্ধতিকে বিবর্তন বলে। চার্লস ডারউন দীর্ঘকাল আগে সে কথা জানিয়ে দিয়েছেন। বিবর্তনের প্রতিযোগিতা যোগ্যতমকে বাঁচিয়ে রাখছে ও উন্নততর প্রজাতির সৃষ্টি করছে। বিবর্তন বাসিন্দাদের বদলেছে ও বদলে দিচ্ছে। তারা আদিম থেকে আধুনিক হয়েছে। জীবনে পরিবর্তনের সুনামি সবকিছু উল্টোপাল্টে দিচ্ছে। সুনামির ঢেউয়ে ভাত ফ্রায়েড রাইস, পোলাও বিরিয়ানি হচ্ছে। আটা-ময়দা মামুলি রুটি-পরটার তকমা ঝেড়ে রকমারি ফাস্টফুড ও জাষ্কফুডে রূপান্তরিত হয়ে নোবেল প্রাপ্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুরগি, ছাগল গায়ের ছাল খুলে উলঙ্গ হয়ে, ডাস্টবিনে মুন্ডু বিসর্জন দিয়ে, সুগন্ধী মশলা মেখে, হট ওভেনে দেহ সেকিয়ে, রঙিন মোড়কে প্যাকেজিং হয়ে ভদ্রলোকের দামি ফ্রিজে থেকে ডাইনিং টেবিলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। পরিবর্তনের ঝড়ে মহিলাদের পোশাক উড়ে যাচ্ছে। যেন বিশ্বব্যাপী বেআব্রু হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যুগ আরও সাহসী হয়ে এসবকে ফ্যাশন বলে চালিয়ে যাচ্ছে।

মানুষের খালি চোখে ধরা না পড়লেও প্রতিটি জীবের মাইক্রোস্কোপিক কোষে এমনকী জীবের জীয়নকাঠি জিনদন্ডের অক্ষরবিন্যাসেও বিস্তর বিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। মানবমস্তিষ্কের অন্দরমহলের বিবর্তন মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পরিয়েছে। বিবর্তনের বরে মানুষের পাখনা গজিয়েছে। মাটিতে তার পা পড়ছে না। প্রাকৃতিক পরিবেশকে ছিন্নভিন্ন করে ভোগ সাগরের নীল জলে সে সাঁতার দিচ্ছে। সাঁতরে পাড়ে পৌঁছবে না রসাতলে যাবে সে কথা ভবিষ্যৎ বলবে।

শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান রক্ষার্থে মানব মস্তিষ্ককে পরিবেশ থেকে তথ্য গ্রহণ করতে হয়। গৃহীত তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত করতে হয়। বাকি সৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে বিশ্বভান্ডার কায়েম করার জন্য ও নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। অভিজ্ঞতালব্ধ স্মৃতিকে মানুষ মস্তিষ্কের ভিতরে ক্যাসেট বানিয়ে রেখে দিতে পারে। পরে প্রয়োজনে মেমোরি ক্যাসেট চালিয়ে পুরনো দিনের সব তথ্যকে সামনে রেখে সে স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।

এত বেশি দায়িত্ব ও এত বেশি ঝাক্কি সামলানোর জন্য দেহের অন্যান্য কোষের তুলনায় ব্রেনকোষের অক্সিজেন ও এ.টি.পি তথা শক্তি তথা গ্লুকোজের ডিমান্ড অনেক বেশি। প্রতি মিনিটে প্রতি একশো গ্রাম ব্রেন টিস্যুর ৩.৫ এম.এল অক্সিজেন দরকার হয়। প্রতি একশো ব্রেনটিস্যুর ৫.৫ এম.জি গ্লুকোজের প্রয়োজন হয় প্রতি মিনিটে। স্বাভাবিক মাত্রায় সামান্য তারতম্য মানব মস্তিষ্কে সাংঘাতিক প্রভাব ফেলে। অ্যানোক্লিক, টক্সিক ও মেটাবলিক আঘাত মুহূর্তে জীবন্ত মানুষকে মড়াতে বদলে দিতে পারে। এ কারণে মস্তিষ্কের রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা সুপরিকল্পিত ও অধিক উন্নত। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি একশো ব্রেন টিস্যুতে প্রতি মিনিটে চুয়ান্ন এম.এল রক্ত চলাচল করে। মানুষের ব্রেনের গড় ওজন চোদ্দশো এম.জি হিসেবে প্রতি মিনিটে সাতশো পঞ্চাশ এম.এল রক্ত মানব মস্তিষ্ককে কাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। শুধুমাত্র সঠিক পরিমাণ রক্ত সরবরাহই যথেষ্ট নয়। মানব মস্তিষ্ক এতটাই সংবেদনশীল যে রক্তের উপাদানের সামান্য ঘাটতি এটাই যে জন্মগ্রহণ করে প্রতিটি মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক সুরে কাঁদতে হয়। শারীরিক ক্রুটির কারণে, প্রসবপ্রক্রিয়া বিলম্বিত ও দীর্ঘ হওয়ার কারণে, চিকিৎসকের ভুলে, ভুল ওষুধের কুফলে বা যে কোনো কারণে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর না কাঁদলে বা দেরিতে কাঁদলে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে ও প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন না পেয়ে শিশুটি মারা যেতে পারে বা লুড়লুড়ে হাত-পা ও ভোঁতা বুদ্ধি নিয়ে সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর বোঝা হয়ে যেতে পারে।

মস্তিষ্কের রক্ত সংবহন ব্যবস্থা বড়ই সংবেদনশীল। মাত্রা পাঁচ সেকেন্ডের জন্য রক্তসংবহন থমকে গেলে মানুষ জ্ঞান হারাতে বাধ্য। স্পাইনাল কর্ডের হাড়ের ফুটো দিয়ে একজোড়া ও গলার মাংসপেশির ভিতর দিয়ে একজোড়া ধমনী ব্রেনের ভিতর ‘সার্কেল অফ উইলিস’ নামে একটি বৃত্ত তৈরি করে। সেই বৃত্তাকার রক্তপ্রণালী থেকে ছ’জোড়া ধমনী উৎপন্ন হয়ে সমগও ব্রেনে রক্ত সরবরহা করে। মস্তিষ্কের ধমনীগুলোর দেওয়ালের বুনুনি খুবই টাইট। স্নায়ুকোষ ও রক্তজালিকার মাঝে থাকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয়। রক্তপ্রবাহে শুধুমাত্র কোষের পক্ষে স্বাস্থ্যকর এমন ভি.আই.পি কণাগুলোই কোষে প্রবেশের অনুমতি পায়। ব্রেন কোষের পক্ষে অনিষ্টকর কোনো পদার্থই সহজে প্রবেশ করতে পারবে না। এই অভিনব বাধাকে ব্লাড ব্রেন ব্যারিয়ার, সংক্ষেপে বি.বি.বি বলে। ব্রেনের এক একটি ধমনী এক একটি অঞ্চলে রক্ত সরবরাহ করে। কোনো কারণে একটি ধমনীতে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে অন্য কোনো ধমনীর রক্ত সহজে সেখানে আসতে পারে না। ফলে রক্তাল্পতায় ভুগতে থাকা এলাকাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এলাকায় টহলরত ধমনী থেকে সূক্ষ্ম শাখাধমনী উৎপন্ন হয়ে ব্রেনের গভীরে ছোট ছোট প্রত্যন্ত এলাকায় রসদ সরবরাহ করে। এদের ল্যাকুনার ধমনী বলে। ল্যাকুনার ধমনীর রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে স্ট্রোক হলে তাকে ল্যাকুনার স্ট্রোক বলে।

মস্তিষ্কের রক্ত সংবহনতন্ত্রের বিপর্যয়ের কারণে স্ট্রোক হয়। এজন্য অসুখটিকে সেরিব্রোভাসকুলার অ্যাক্সিডেন্ট, সংক্ষেপে সি.ভি.এবলে। এই বিপর্যয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। অঘটন ঘটায় মস্তিষ্কের সংবহনতন্ত্রে কিন্তু অসুস্থ হয় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অসুস্থতায় হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বেঁচে ফিরলে কম বেশি পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। মানুষের স্নায়ুতন্ত্রই তার যাবতীয় জারিজুরির যাদুমন্ত্র। স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশ ছাড়া হাত-পাও নড়ে না। মুখ থেকে কথাও বের হয় না। মানুষের স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে সামান্য ধারণা না থাকলে স্ট্রোকের ক্ষয়ক্ষতি ও পরিণতি বুঝতে অসুবিধে হবে।

শরীরের ভিতর ও শরীরের বাইরের পরিবেশের পরিবর্তনের খবরের ওপর ভিত্তি করে মানুষ সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। শরীরের ভিতর ও বাইরের খবর জোগাড় করা, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করার জন্য দুটো মাধ্যম আছে। দেহরসের রাসায়নিক পদার্থের হেরফের ঘটিয়ে ও স্নায়বিক সংযোগের মাধ্যমে মানুষ পরিবেশ ও শরীরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। দ্রুত, সুনির্দিষ্ট, সুচারু ও সুপরিকল্পিত যোগাযোগ রক্ষায় স্নায়ুতন্ত্র এক্কেবারে স্বতন্ত্র, সম্ভ্রান্ত ও শ্রেষ্ঠ।

মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ও প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র এই দু’ভাগে ভাগ করা হয়। ব্রেন তথা মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ড তথা সুষুম্নাকান্ড নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র অর্থাৎ সেরিব্রোস্পাইনাল স্নায়ু। এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গানুগোতে অবস্থিত স্নায়ু অর্থাৎ ভিসেরাল তথা স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠিত। বারো জোড়া মস্তিষ্কের ভেতরের স্নায়ু তথা ক্রেনিয়াল নার্ভ ও একত্রিশ জোড়া স্পাইনাল নার্ভ নিয়ে সেরিব্রোস্পাইনাল তন্ত্র গঠিত। সিম্প্যাথেটিক ও প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুদের নিয়ে স্বয়ংক্রিয় তথা ভিসেরাল তথা অটোনমিক স্নায়ুতন্ত্র গঠিত। স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের কাজ মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী হয় না।

শরীর ও পরিবেশের খবরখবর কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রগামী অর্থাৎ অ্যাফারেন্ট স্নায়ু দিয়ে মস্তিষ্কে আসে। সেই খবর মস্তিষ্কের মধ্যে থাকা বিভিন্ন স্নায়ুকেন্দ্রের দ্বার বিশ্লেষিত হয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মস্তিষ্কে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রগামী অর্থাৎ ইফারেন্ট স্নায়ু দিয়ে দূরে থাকা দেহ অঙ্গানুসমূহে পৌছে বাস্তবায়িত হয়। সেদিক থেকে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপকে কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করে চলে। এখানেও কম্পিউটারের মতো তথ্যের ইনপুট হয়, সঞ্চিত স্মুতি দিয়ে বিচার করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ও আউটপুট সিস্টেমের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়। যদিও মানুষের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ, মনুষ্য নির্মিত কম্পিউটারের থেকেও জটিল ও উন্নত। মানব মস্তিষ্ক কোনোরকম ইনপুট ছাড়াও চিন্তাভাবনা করতে পারে, স্বপ্ন দেখে। নতুন নতুন সৃষ্টি করতে পারে। আবিষ্কার করতে পারে। এই উচ্চশক্তিসম্পন্ন মস্তিষ্কের পুণ্যে মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হতে পেরেছে।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment