মারণ খেলা: ব্লু হোয়েল

515 Views 0 Comment

ব্লু-হোয়েল রূপকথার ড্রাগন, ঘরে ঘরে তার হানা। সর্বত্র উদ্বেগ আর আতষ্ক, পরিবারে পরিবারে অকাল শোকের ছায়া, ব্লু-হোয়েল-এর নেশায় ধুঁকছে তরুণ তাজা প্রাণ।

এর আকর্ষণ দুর্নিবার, জীবন ছিনিয়ে নিতে এর জুড়ি মেলা ভার। নেচিবাচক বাধ্যতায় ক্রমশ ভোঁতা, অসাড় হয় এদের মননশক্তি ছুটে চলে মৃত্যুযজ্ঞে। খিদে কমে যাচ্ছে, ঘুম নেই, ভোর চারটে থেকে উঠে পড়ছে, সময়ের বোধ কমে যাচ্ছে, হাসি-কান্নার বোধ নষ্ট করে দুর্বার গতিতে খারাপের দিকে ধেয়ে চলছে আমাদের শিশুরা। দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী সকলের মধ্যে এই নেশা ছড়িয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার আমরা।

কেস : ওয়ান

না ম্যাডাম, ব্লু-হোয়েল আমি আর খেলি না।

–তার মানে তুই খেলতি?

২৪ জুলাই হঠাৎ সে সেফটি পিন খায়, কানে পাথর কটি, ঝাটার কাঠি ঢোকায়।

দারুণ ভাবে অস্থির কিন্তু অস্বাভাবিক আচরণ করতে পিছপা হয় না, কলেজে দু’টাকার কয়েন গিলে ফেলে। হসপিটালে গিয়ে সেটা বার করা হয়। কেন এই বিড়ম্বনা?

ঈশ্বর এর নামে না হয় বাবা-মা-এর আচরণকে কাঠগড়ার দাঁড় করিয়েছে। ‘নিজেকে খুন করতে চেয়েছিলাম’—স্বীকার করে সে।

ব্লু-হোয়েলের বৈশিষ্ট্য হল তার লাইফ স্প্যানে সে নিজেই চলে আসে সমুদ্র তীরে। ২০০৮ সালে এক সাথে ৫৫ টি নীল তিমি সমুদ্র সৈকত চলে আসে। কিন্তু উদ্ধারকারীরা তাদের সাগরে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হয়। ধীরে ধীরে মৃত্যুরঅভিমুখে নিজেদের নিয়ে যাওয়াই যেন এদের স্বনির্বাচিত ভবিতব্য। এই জন্যই সম্ভবত এই নামের গেম চালু হয়।

২০১৩-তে রাশিয়ায় শুরু হয়। তারপর ভাইরাল।

পৃথিবীতে নেতিবাচক দিকেরও একটা মোহ আছে, তা দিয়েই সবথেকে বেশি ব্রেন ওয়াশ শুরু হয়। দুঃখের বিনির্মাণ হয় মুখ্য বিষয়। অবসাদ যখন চেতনায়, মননে, সেই দুর্বল মুহূর্তে এই জটিল আবর্তে ঢুকে পড়ে, অভিরুচি প্রতিহিংসা নেওয়ার, কিন্তু নিজেকে শেষ করে।

অদ্ভুতুড়ে, অলৌকিক বিষ বাষ্পে বাতাস বিষাক্ত। অদূরদর্শী, বিবেকহীন, হতাশাগ্রস্ত ভুল নেতৃত্ব ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। সন্তান লক্ষ্যভ্রষ্ট বিপথগামী, দিশেহারা।

কার জীবনে সমস্যা নেই? কে বলেছে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না? মানছি, অনুশাসনের উৎপীড়ন আছে। উপেক্ষার যন্ত্রণাও সমধিক। ঘরে ভাসোবাসা নেই, বিদ্যালয়ে শাসনের ভয়, বাইরে উপেক্ষার পাত্র। ভৎসনা, উপেক্ষা আর শাসনে আমাদের বাচ্চারা নিয়ত পীড়িত, কুন্ঠিত। হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটে তাদের। নৈতিক মূল্যবোধ নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। বিপথগামিতা চরিত্রের কোথাও আছেই, না হলে অস্বাভাবিকতার প্রতি প্রীতি কীসের জন্য? অক্ষম সাহসিকতা দেখানোর চপলতা আছে কিন্তু স্থিরতার শক্তি নেই। খেই হারিয়ে খাবি খাচ্ছে, বিচ্ছিন্নতার ভুলভুলাইয়ায় পথ হারাচ্ছে, এই খেলার পেছনে কত কোটি টাকার ব্যবসা সেটা তারা ভেবে দেখছে না।

বাবা-মায়েদের সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। কিউরেটর, প্রথমে কথা বলতে গিয়েই ছেলেমেয়েদের সম্পর্ক যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে ফেলে, কথায় জালে এমনভাবে আটকায় যাতে সমস্ত তথ্য তথা গোপনীয় যাবতীয় তথ্য তারা সেই ব্যক্তির গোচরে আনে।

সারফেস ওয়েব, ডিপ ওয়েব, ডার্ক ওয়েব। ডার্ক ওয়েব-এ মানুষকে পীড়িত করে মারার ভিডিওগুলো দেখানো হয়। ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা হয় সুইসাইড করতে।

মানসিক বিকারগ্রস্ত কিছু মানুষ এক্ষেত্রে অনুদান দিয়ে এই বিকৃতির মজা উপভোগ করে।

বিষন্নতার শিকার যারা তারা বিশেষ ভাবে এর মধ্যে আটকে যায়। সে হয়তো কোনোদিন জানবেও না সে বিষণ্নতার রোগী। কিক খুজতে গিয়ে জীবন শেষ করে দেওয়ার চ্যালেঞ্জে মেতে ওঠে। হঠাৎ করে ছেলেমেয়ের কোনো পরিবর্তন, যা তারা স্বাভাবিক ভাবে করে না, চোখে পড়লেই সচেতন হবেন। খেলা শুরু করে বন্ধ করতে না চাইলে তাকে ভীষণভাব ভয় দেখানো হয়। অবসাদ কমার বদলে ভীষণভাবে বেড়ে যেতে পারে, কোনোভাবেই বেরিয়ে আসার পথ তারা পায় না। পরিণতি সেচ্ছামৃত্যু।

বস্তৃত মনোজগতের উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, এ নিম্ফলতার, বিফলতার করুন চিত্র। এর থেকে বেরোতেই হবে। অমায়িক জীবনযাত্রায় চটক থাকলেও, এতে সম্পূর্ণতার আনন্দ নেই। কারণ ক্ষুদ্রতার, তুচ্ছতার বুকেও যে অমৃত লুকোনো থাকে। বোতাম আটা পোষ মানা হতে হবে না, সঠিক মূল্যায়ন, আচরণ ও ভাবনাকে সংযমের রাশে বাঁধতে হবে। ভয়ের কোনো আকার নেই, ভয়ের কবলে পড়ার কোনো মানে নেই।


সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment