মেনোপোজ এবং খাদ্যাভাস

398 Views 0 Comment
মেনোপোজ এবং খাদ্যাভাস

মেনোপোজ অর্থাৎ ৪৫-৫৫ বয়সের মধ্যে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার নাম মেনোপোজ। মোনোপোজ শুরুর ৪-৫ বৎসর পূর্ব হতেই এর কিছু উপসর্গ শুরু হয়। যেমন অনিয়মিত মাসিক, শরীর হঠাৎ গরম হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, ওজন বৃদ্ধি,যৌন অঙ্গের শুষ্কতা,শুস্ক ত্বক, চোখ, অতিরিক্ত ঘাম ইত্যাদি।বিসন্নতা, উদ্বেগ, ভয় ইত্যাদি মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া মেনোপোজ হওয়ার পর উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট এটাক, অস্থিক্ষয় ঝুকি বৃদ্ধি পায়। মোনোপোজ বিষয়ে অনেকের পূর্ব ধারনা না থাকায় উপসর্গগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনা।মেনোপোজ হওয়া,এটি একটি প্রাকৃতিক নিয়ম।মহিলাদের মধ্য বয়সের শেষের দিকে এটি শুরু হয়। এ শুরুটি কারো আগে হয় কারো পরে হয়। সাধারনত যাদের পরিবারের মা- দাদী, নানীদের আগে মেনোপোজ হওয়ার ইতিহাস আছে, যারা নিয়মিত ধুমপান করেন,যাদের সন্তান নেই, যারা কেমোথেরাপি নিয়েছে বা যাদের পেলভিক রেডিয়েশন হয়েছে বা ওভারী অপসারণ করা হয়েছে,বা বিশেষ অসুস্থতা যেমন রিমাটয়েড আথ্রাইটিজ, থাইরয়েডের সমস্যা, এইচ আইভি ইত্যাদি কারনে নির্দিষ্ট বয়সের আগে মেনোপোজের দেখা দেয়।শরীরের এই পরিবর্তনকে সহজ ভাবে মেনে নেয়াটাই এর সব চেয়ে বড় চিকিৎসা।এছাড়া খাদ্য ও জীবন যাত্রার মান পরিবর্তন করে এ অবস্থাকে মোকাবেলা করা যায়।সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে মাসিক হলে বা মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্ত গেলে বা অন্যান্য উপসর্গে ফিজিশিয়ানের স্মরণাপন্ন হওয়ার প্রযোজন হয়, আবার কেউ কেউ এ সময় হরমোন থেরাপি নিতে পারে।মানসিক সহযোগীতার জন্য কাউন্সেলিং সেবা নেয়া যায়।মেনোপোজ সময়ে মহিলাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণ করা খুবই জরুরী। একজন পুষ্টিবিদ বা ডায়েট বিশেজ্ঞগ এ বিষয়ে সহযোগীতা করতে পারেন।আমাদের খাদ্য অভ্যাস মেনোপোজ দেরিতে শুরু হওয়া এবং মেনোপোজের সমস্যা গুলো সহজ করতে ভুমিকা রাখে।আমরা জেনেছি, মেনোপজের পরবতীতে ওজন বৃদ্ধি, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, হাড়ক্ষয় রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায় ও মহিলারা বিষন্নতায় ভোগে। ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি এ রোগ গুলি উপশমের জন্য খাদ্যেরও গুরুত্বপূর্ন ভুমিকাআছে। আমরা মনোপোজের উপসর্গ শুরুর আগে থেকেই এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারি।একটি স্টাডি থেকে জানা গেছে যে, মাছের তেল, ডাল জাতীয় খাদ্য ভিটামিন বি-৬ ও জিংক, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি মেনোপোজ শুরু হওয়া বিলম্ব করতে সাহায্য করে তাই এসকল পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ খাদ্য দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় রাখা,যে মহিলা ধুমপান করেন তার ধুমপান ছেড়ে দেয়া, অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা কাম্য ওজনে নিয়ে আসা, নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করা। মোনোপোজ সময়ে মহিলাদের ওজনবৃদ্ধির প্রবনতা দেখা যায় তাই এ সময় বয়স, উচ্চতা,কাজের ধরনের উপর দৈনিক খাদ্য হতে কত ক্যালরী গ্রহণ করবে তা নিধারণ করতে হবে এবং নির্ধারিত ক্যালরী অনুযায়ী খাদ্য গ্রহন করতে হবে।কম ক্যালরী যুক্ত সুষম খাদ্য গ্রহনের মাধ্যমে আদর্শ ওজন বজায় রাখতে হবে।এ সময় প্রোটিন জাতীয় খাদ্য যেমন মাছ, দুধ, বাদাম বিভিন্ন ধরনের ডাল গ্রহন স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বৃদ্ধি করতে হবে। এ ধরনের খাদ্য হরমোনের ব্যালেন্স, রক্ত শর্করা ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করবে। সামুদ্রিক মাছ, ওয়ালনাট, বাদাম ও মাছের তেল ইত্যাদি ওমেগা- থ্রি ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। ওমেগা- থ্রিফ্যাটিএসিড সমৃদ্ধ খাদ্য মুড পরিবর্তন উন্নত করে,উত্তেজনা ও বিষন্নতা কমাতে সাহায্য করে। মহিলাদের এ সময় অস্টিওপরোসিস বা হাড়ক্ষয়ে যায় তাই হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার দুধ, ছানা,পনির, দই, মাছ,কাটাসহ ছোটমাছ,মেথি শাক ,পালংশাক, ফুলকপির পাতা, কালো কচুর শাক, সজনে পাতা ইত্যাদি এবং ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ দুধ, যকৃত, তৈলাক্ত মাছ খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ এবং আঁশ জাতীয় খাবার অবশ্যই রাখতে হবে।আঁশজাতীয় খাদ্য ওজন কমাতে ও রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করবে।বাটার, ঘি ইত্যাদি সম্পৃক্ত ফ্যাটিএসিড সমৃদ্ধ খাদ্যের পরিবর্তে অসম্পৃক্ত ফ্যাটিএসিড সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- সূর্যমুখী,কর্ণ, ক্যানোলা বা রাইসব্রার্ন তেল,অলিভওয়েল,বিভিন্ন ধরনের বাদাম, এ্যাভোকাডো ইত্যাদি গ্রহন করতে হবে।
খাদ্য তালিকা হতে প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমলপানীয়, নানাধরনের ফাস্ট ফুড ও ট্রান্সফ্যাট, অতিরিক্ত লবন, রিফাইন্ড কাবোহাইড্রেট, উচ্চ ক্যালরি যুক্ত খাবার বাদ দেয়া ভালো।তবে মনে রাখতে হবে ব্যক্তির অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনায় রেখে খাদ্য নির্বাচন করতে হবে।
মেনোপোজ বা রজবন্ধ হওয়া হরমোনজনিত প্রাকৃতিক নিয়ম হলেও এ সময়ের পরিস্থিতি গুলো সবাই একইভাবে মেনে নিতে পারেনা তাই এ সময়ে পরিবারের সদস্যদের সহযোগীতা প্রয়োজন। স্বামী এ সময় সবচেয়ে বেশী মানসিক সাপোর্ট দিতে পারে। পরিবারের সদস্যরা এক সাথে বেড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারে।এছাড়া একজন মহিলা নিজের আগ্রহে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত হওয়া,পছন্দের ছবি দেখা, বইপড়া,গান শোনা,বাগান করা ইত্যাদি ভালো এবং পছন্দের কাজ করে সময় কাটাতে পারে।

মাহফিদা দীনা রুবাইয়া
পুষ্টিবিদ ও ডায়েট কনসালটেন্ট

0 Comments

Leave a Comment