শিশুদের জল খাওয়াতে ভুল যেন না হয়, হতে পারে প্রস্রাবের জটিল সমস্যা

273 Views 0 Comment

সাধারণত মাতৃগর্ভে বারো সপ্তাহ থেকে শিশুর কিডনি তৈরি হয়ে যায় এবং মায়ের পেটে থাকতে থাকতেই ওই সময় থেকে প্রস্রাব করে থাকে। সকল নবজাতকই জন্মের আটচল্লিশ ঘন্টা সময়সীমার মধ্যে প্রস্রাব করে থাকে ফিটাস। এবং না করলেই অশনিসংকেত কোনো সিরিয়াস জন্মগত ক্রুটির, যেমন অবস্ট্রাকটিভ ইউরোপ্যাথি, কিডনি তৈরি না হওয়া (আজেনেসিস অফ কিডনি) ইত্যাদি।

একটি নবজাত শিশু সাধারণত প্রতিবার বুকের দুধ খাওয়ার পরই প্রস্রাব করে এবং তার দিনে প্রায় ছ’থেকে বারো বার। অনেক নবজাতক প্রস্রাব করার পূর্বে কেঁদে ওঠে। এটা ভয়ের কিছু নয়। আসলে কি হয়, প্রস্রাব জমে গেলে মূত্রথলি বা ব্লাডার ভর্তি হওয়ার কারণে একটু অস্বস্তি হয়। তাই প্রস্রাব হয়ে গেলেই শিশুটি আবার শান্ত হয়ে যায়। আবার অনেক সময় প্রস্রাব হয়ে যাওয়ার পর নবজাতকটি কেঁদে ওঠে। সেটার কারণ আর কিছুই নয়, ভিজে ন্যাপিতে অস্বস্তি। তাই মাকে পরামর্শ শিগগিরি বদলে দেওয়ার। তবে শিশুটি প্রস্রাবের সময় যদি স্ট্রেটনিং বা কষ্ট করে প্রস্রাব করে বা ফোঁটা ফোঁটা করে প্রস্রাব করে (যাকে  বলে ড্রিবলিং) তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। একটু জেনে নিই শিশুদের প্রস্রাবের আর কী কী সমস্যা হতে পারে।

  • হিমাচুরিয়া বা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া: খুব অল্প পরিমাণ রক্ত (এক লিটার প্রস্রাবের মাত্র এক মিলি) প্রস্রাবের রং লাল করে দিতে পারে। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব না করলে যে ঘন মূথ্র জমে থাকে তাকে ভুল করে হিমাচুরিয়া মনে হতে পারে। এছাড়া কিছু কিছু ওষুধ যেমন যক্ষ্মরোগের ওষুধ রিফামপিসিন খেলে, প্রচুর পরিমাণে বীট খেলেও প্রস্রাব রক্তবর্ণ হতে পারে। তাই একমাত্র মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করলেই প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব। এবং এটি করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

যে যে কারণে হিমাচুরিয়া হতে পারে তা হল ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা মূত্রনালীতে সংক্রমণ, বার্থ-অ্যাসফিক্সিয়া, রেনাল আর্টারি বা ভেন থ্রম্বোসিস (যেমন মায়েরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত), অবস্ট্রাকটিভ ইউরোপ্যাথি, রেনাল স্টোন, কনজেনিটাল সিফিলিস, কিছু টিউমার, ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার, এমনকী সাপের কামড়ের পরও হতে পারে।

  • অগলিগুরিয়া: যদি সারাদিনে প্রস্রাবের পরিমাণ ৫০০ মিলি-র কম হয়, কিংবা অন্যভাবে বলতে গেলে যদি প্রস্রাবের হার ০.৫ মিলি/কেজি/ঘন্টা-র কম হয় তবে তাকে ওলিগুরিয়া আখ্যা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে অ্যানুরিয়া অর্থাৎ বারো ঘন্টা ধরে যদি কোনো প্রস্রাব না হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় ডায়রিয়া-ডিসেন্ট্রির পর কিডনি আর কাজ করছে না। মারাত্মক ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতার কারণে এমনটা হয়ে থাকে। মায়েরা হয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণ ও.আর.এস না খাইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক এবং নানাবিধ ওষুধ খাওয়াতে ব্যস্ত থাকেন। ফলশ্রুতি অ্যাকিউট রেনাল শাটডাউন বা রেনাল ফেইলিওর। এছাড়া তো অবস্ট্রাকটিভ ইউরোপ্যাথি রয়েছেই। কিছু জন্মগত ক্রুটি, যেমন অ্যাবনরমাল রেনাল আর্টারি, রেনাল স্টোন বা পাথর ইত্যাদি কারণে প্রস্রাবের অস্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হলে কিডনি প্রবল চাপের মধ্যে থাকে এবং যেকোনো সময়ে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এমনকী কিছু নেফ্রোটক্সিক ওষুধ (যেগুলো কিডনির পক্ষে ক্ষতিকর), যেমন অ্যামাইনোগ্লাইকোসাইডস অনেক সময় অতিরিক্ত ডোজে ব্যবহুত হলে কিডনি বিকল হতে পারে। এটি আমাদের দেশে কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম কারণ। তাই বলি প্রয়োজন ছাড়া একদম না। যেকোনো ডায়রিয়ায় (শিশুদের অধিকাংশ ডায়রিয়াই ভাইরাল) হোক না কেন, যদি রক্ত না যায়, তবে নো অ্যান্টিবায়োটিক্স, শুধু শুধুমাত্র ও.আর.এস-এর জল খেলেই তিন-চারদিন রোগ সেরে যায়। এবং অ্যাকিউট রেনাল ফেইলিওর হওয়ার আশষ্কা কমে।

  • পলিইউরিয়া: প্রস্রাবের হার যদি দৈনিক চার থেকে-ছ’ মিলি প্রতি কেজি-র বেশি হয়, এটির কারণ হল কিডনির কনসেনট্রেশন বা ঘন করার ক্ষমতা বিঘ্নিত হওয়া। ডায়াবেটিস মেলাইটাস, ফ্যানকনি সিনড্রোম, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস ইত্যাদি রোগে এমনটা হয়ে থাকে। এর সঙ্গে আর যেটা থাকে তা হল পলিডিপসিয়া অর্থাৎ বারবার তেষ্টা পাওয়া।
  • ইডিমা: বিশেষ করে চোখ-মুখ ফুলে যাওয়া কিডনি রোগের একটি অন্যতম লক্ষণ। যেমন ধরুন একটি শিশুর টনসিলে ইনফেকশন আছে, সেটা হয়তো ওভারলুক করে গেছেন বা ঠিকমতো চিকিৎসা করা হয়নি। সেটা থেকে হঠাৎ করে পোস্ট-ইনফেকশাস গ্লোমেরুলো নেফ্রাইটিস হতে পারে। এতে কী হয়? এতে হঠাৎ করে দেখা যায় শিশুটির প্রস্রাব কমে যাচ্ছে, প্রস্রাবে রক্ত যাচ্ছে, দেহে ফ্লুইড জমা হয়ে শরীর ফুলে যাচ্ছে। বেশি ফ্লুইড জসা হওয়ার কারণ শ্বাসকষ্ট, ধীরে ধীরে হার্ট ফেইলিওর হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ সময় রক্তচাপ যদি বেড়ে যায় তাহলে শিশুটির খিঁচুনিও হতে পারে। আবার অন্যদিকে কিডনির ভিতর যে ফিল্টার বা ছাঁকনি থাকে (গ্লোমেরুলাস), নেফ্রোটিক সিনড্রোম সেই ছাঁকনিতে গন্ডগোল ঘটে, যার ফলে প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন বেরিয়ে যায়, রক্তে প্রোটিনের মাত্রা কমে যায়, কোলেস্টেরলেল মাত্রা বেড়ে যায় এবং শরীরে জল জমে ফুলে যায়।
  • এছাড়া পেটে ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালা, প্রস্রাবের রং ঘোলা এগুলো প্রস্রাবে সংক্রমণ, অ্যাকিউট পায়েলোনেফ্রাইটিস, কিডনিতে পাথর ইত্যাদি কারণে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আলট্রাসোনোগ্রাফি করলে কিডনি ও মূত্রতন্ত্রের অ্যানাটমি পরিষ্কারভাবে ধরা যায়।
  • এছাড়া বিছানয়য় প্র্রস্রাব করা, সরু হয়ে প্রস্রাব বা ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব, প্রস্রাবের সময় কান্নাকাটি করা এগুলো কিন্তু কোনোটাই স্বাভাবিক নয় এবং উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। যেমন ছোট্ট শিশুর ফোঁটা ফোঁটা করে প্রস্রাব হওয়া অনেক সময় জন্মগত ক্রুটির জন্য হয়ে থাকে, সব থেকে কমন কারণটি হল পোস্টিরিয়র ইউরেথ্রাল ভালব অর্থাৎ মূত্রনালীতে বাধাপ্রাপ্তি।

কিছু নার্ভের গন্ডগোল, যেমন স্পাইনাল ডিসর‌্যাফিজমে শিশুটি প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, এক্ষেত্রেও ড্রিবলিং বা ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাবের সমস্যা দেখা যায়।

  • শিশুদের বিছানায় প্রস্রাব: ডাক্তারি পরিভাষায় নকচারনাল এনুরেসিস বলে। সাধারণত শিশুরা জন্মের পর দুই-তিন বছর পর্যন্ত ঘুমের মধ্যে বিছানায় প্রস্রাব করে থাকে। এটা কোনো রোগ নয়। এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যেহেতু আড়াই বছর বয়সে স্নায়ুতন্ত্রের ম্যাচিওরিটি বা পরিপক্কতা আসে না, তাই প্রস্রাব ও পায়খানা ধারণ করার ক্ষমতা যা মস্তিষ্ক থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে এমনটি হওয়া স্বাভাবিক। দুই-তিন বছর পর্যন্ত মেরুদন্ডের কোমরের অংশের স্নায়ুতন্ত্র প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করে তাই তখন ঘনঘন প্রস্রাব হয় এবং সত্যিকার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিন বছরের পর মস্তিষ্কের মূল অংশ বা সেরিব্রাল কর্টেক্স এটি নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে প্রস্রাবের প্রক্রিয়াটিও কারো নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আর এই প্রক্রিয়া যদি দেরি হয় বা কোনো কারণে এর নিয়ন্ত্রণ স্যাক্সাম প্লেক্সাসেই বিদ্যামান থাকে, তখনই বিছানায় প্রস্রাবের উপসর্গ দেখা দেয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলসেমি, প্রস্রাব প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদী ইনফেকশন, কিছু জন্মগত, গঠনগত বিকৃতি যেমন ক্ষুদ্রাকৃতি কিডনি, একের অধিক বৃক্কনালী বা ইউরেটার ইত্যাদি এর জন্য দায়ী।

কয়েকটি নিয়ম মেনে চললে বিছানায় প্রস্রাবের সমস্যায় সুরহা সুরহা মিলতে পারে–

  • শোয়ার আগে প্রস্রাব করান এবং সম্ভব হলে মাঝরাতে একবার প্রস্রাব করান।
  • প্রস্রাবে ইনফেকশন থাকলে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে। এরপরও অসুবিধা থাকলে এমিট্রিপটাইলন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ক্রনিক কিডনি ডিজিজ: এর লক্ষণসমূহ হল হাইপারটেনশন, গ্রোথ রিটারডেশন বা ঠিকমতো বেড়ে না ওঠা, অ্যানিমিয়া ইত্যাদি।
  • পেটে হাত দিয়ে পরীক্ষা: করলে কিডনির যে সব রোগ ধরা যেতে পারে (প্যালপেবেল কিডনি) পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ, হাইড্রোনেফ্রোসিস, উইলম টিউমার ইত্যাদি।

প্রতিরোধ

কিডনি চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই প্রতিরোধ করাই উত্তম পন্থা। নবজাতকের ভূমিষ্ট হওয়ার পূর্বেই উন্নত বিশ্বে আলট্রাসোনোগ্রাম করে সমস্যা দেখলে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাক। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এজন্য চাই সার্বিক সচেতনতা। বাচ্চা পেটে থাকাকালীন আলট্রাসোনোগ্রাম করে তার হার্ট ও কিডনিটা দেখা উচিত। তাহলে আগে থেকে চিকিৎসা করা সম্ভব। একে বলা হয় ‘ফিটার থেরাপি’। বিশেষ করে কিডনিতে জল জমা (হাইড্রোনেফ্রোসিস)-এর চিকিৎসা মারাত্মক ক্ষেত্রে তো আগেভাগেই করে ফেলা যায়।

আর একটি সাবধানবানী। শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। কেননা অনেক ওষুধ আছে যা কিডনিকে নষ্ট করে দিতে পারে। তাই বাইরের দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেউ কোনো ওষুধ দিতে পারে না।

এবং প্রস্রাবে যদি সংক্রমণ ধরা পড়ে তবে ইউরিক কালচার ও সেনসিটিভিটি অবশ্যই করানো দরকার। তা না করে হুটহাট অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করলে আখেরে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার আগে প্রস্রাব পরীক্ষা করান এবং কালচার-সেনসিটিভিটি রিপোর্ট হাতে পেলে রিপোর্ট মোতাবেক দশ থেকে চোদ্দদিন পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ান। এ বিষয়ে চিকিৎসা তাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment