শিশু অতি চঞ্চল হলে মারধোর একদম নয়

747 Views 0 Comment

কেস স্টাডি: সংলাপ-এর বয়স চার বছর। খুবই চঞ্চল। এই সে কোনো জিনিস টেবিলে রাখল তো অল্প সময়ের মধ্যেই ওই জিনিস থেকে আকর্ষণ হারিয়ে বসে পড়ল চেয়ারে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চেয়ার থেকে খাটে উঠে লাফালাফি। আবার কিছুক্ষণ পর বাবার ঘাড়ের ওপর। সাধারণত সে একটুও স্থির থাকে না। খুব দ্রুত একটা থেকে আরেকটার মধ্যে চলে যায়। কখনো বা ধ্বংসাত্মক বা ডেসট্রাকটিভ হয়। যেমন কোনো দরকারি জিনিস জানালা দিয়ে ফেলে দিল, কিংবা কোনো জিনিস ভেঙে ফেলল। আর এসব কর্মকান্ড সে এত দ্রুত করে যে বড়রা সামলানোর সুযোগও পায় না।

সাধারণত ছোটরা একটু দুরন্ত বা চঞ্চল প্রকৃতির হয়। তবে দুরন্তপনা বা চঞ্চলতা মাত্রা ছাড়ালে তা অসুখ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই চঞ্চলতার নাম ADHD বা অ্যাটেনশন হাইপার-অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার যা অতিচঞ্চলতা জনিত মনোযোগ ঘাটতি। এ ধরনের শিশু জীবনে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা ও সতর্কতা জরুরি।

পরিসংখ্যান

ভারতবর্ষে ADHD-শিশুর কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান মেলে না। তবে সারা বিশ্বে এর হার ৫.২৯%। মেয়েদের (১.৫%) তুলনায় ছেলেদের (৫.৩%) মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি। যদিও এটি শিশু বয়সে শুরু হয় তবে, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে তা টিন এজ পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে থেকে যায়।

কোন বয়সে বাচ্চা

হাইপার অ্যাক্টিভ হয়

এক বছর, দু’বছর কিংবা পাঁচ বছরের শিশু কী ধরনের আচরণ করে, তা কিন্তু আমরা জানি। কিন্তু বয়স অনুযায়ী তার যে আচরণ বা চঞ্চলতা থাকার কথা, সেটা না থেকে তার চেয়েও যদি অনেক বেশি পরিমাণে চঞ্চলতা ও দুরন্তপনা থাকে তা সাধারণত অভিভাবকরাই বুঝতে পারেন। বয়স বাড়লেই যে এটি আপনা আপনি ঠিক হয়ে যায়, তাও কিন্তু নয়। অতিচঞ্চলতা বড় হলেও থেকে যেতে পারে।

লক্ষণ কী কী

অন্যমনস্কতা, অতিচঞ্চলতা এবং আবেগপ্রবণতা- এই তিনটি হল ADHD-র প্রধান আচরণগত বৈশিষ্ট। তবে রোগ নির্ণয়ের জন্য এই লক্ষণগুলো কমপক্ষে ছ’মাস থাকতে হবে এবং বয়সভিত্তিক আচরণের থেকে অনেক বেশি হতে হবে।

  • অন্যমনস্কতা: (কমপক্ষে টি উপসর্গ থাকতে হবে)
  • বিভিন্ন ক্ষেত্রে অমনোযোগিতা, অসাবধানতার জ্য ভুল হয়ে থাকে।
  • মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা।
  • কোনো কাজ করতে বসে একটুতেই ‘বোর’ হয়ে যাওয়া, কোনো কাজ বা প্রকল্প সম্পাদনে অসফলতা।
  • কোনো নির্দিষ্ট কার্যকলাপ সংগঠিত করতে অসুবিধা।
  • মনোযোগ লাগে এমন কাজগুলো এড়িয়ে যাওয়া।
  • কোনো কর্মসম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস ভুলে যাওয়া, যেমন হোমওয়ার্ক করতে বসে পেনসিল খুঁজে না পাওয়া।
  • সরাসরি কথা বলার সময় ঠিকমতো না শোনা।
  • দিবাস্বপ্ন দেখা, সগজেই বহিঃস্থ উদ্দীপকের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া।
  • দৈনন্দিন কাজকর্ম ভুলে যাওয়া।
  • হাইপার অ্যাক্টিভিটি/ প্রয়োজনাতিরিক্ত কাজ করা (যেকোনো তিনটি)
  • প্রচন্ড উসখুস করা।
  • অনুপযুক্ত সময়ে আসন ত্যাগ করা, সে খাওয়ার টেবিলে হোক কিংবা স্কুলে অথবা কোনো গল্প বলার সময়ে হোক।
  • অসঙ্গত কারণে দৌড়ানো বা ঝাঁপ দেওয়া, সবসময় অস্থিরতা।
  • শান্তভাবে খেলতে অসুবিধে।
  • `On thd go’ বা ‘driven by a motor’।
  • আবেগপ্রবণতা (যেকোনো একটি)
  • প্রচুর কথা বলা, ননস্টপ বকবক (যা পরিবেশ উপযোগী নয়)।
  • প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর দিয়ে দেওয়া।
  • নিজের দানের বা সুযোগের জন্য অপেক্ষা না করা।
  • অন্য জায়গায় বা অন্যের আলোচনায় অনাধিকার প্রবেশ বা সাময়িক যোগাযোগ ছিন্ন করা।

ADHD-এর কারণ কী

অতি সম্প্রতি ব্রেনের ফাংশনাল এম.আর.আই পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, ADHD আক্রান্ত শিশুদের ব্রেনে ফ্রন্টাল লোব, বেসাল গ্যাংলিয়া, করপাস ক্যালোসাম এবং সেরিবেলার ভারমিসে গন্ডগোল পাওয়া গেছে। ব্রেনের এই অংশগুলো মনঃসংযোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে জরুরি। ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণায় ব্রেনের ফ্রন্টাল-সাবর্টিকাল সেরিবেলার সার্কিট অস্বাভাবিকত্ব পাওয়া গেছে। ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার সিস্টেমে গোলযোগ এর অন্যতম কারণ। এছাড়া পরীক্ষা করে জানা গেছে এই অসুখের পেছনে রয়েছে জেনেটিক কারণ। জিন হল সেই ‘ব্লু-প্রিন্ট’ যা কিনা আমরা আমাদের জনক-জননীর কাছ থেকে উত্তরধিকার সূত্রে পেয়ে থাকি এবং জিন-ই নির্ধারণ করে আমাদের ভবিতব্য। এছাড়াও তো রয়েছে পরিবেশগত কারণ যেমন গর্ভাবস্থায় মায়ের ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদির বদভ্যাস। এল.বি.ডব্লিউ (শিশুর জন্মের সময় ওজন ২৫০০ গ্রামের কম) সমস্যা, প্রি-ম্যাচিওরিটি, নিওনেটাল জনডিস এগুলোকেও দায়ী করা হয়। এগুলোর বাইরে, প্রি-স্কুলাদের মধ্যে লেড পয়জনিং (পেইন্ট বা প্লাম্বিং সামগ্রী থেকে) অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর।

আর একটা কথা বলে রাখা ভালো, কোনো কারণ ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে ADHD হতে পারে।

চিকিৎসা

যেহেতু একটি মাল্টি ফ্যাক্টরাল অসুখ, তাই প্রথমেই যদি সন্দেহ হয় বা বুঝতে পারেন যে বাচ্চা অন্যমনস্ক ও অতিচঞ্চল, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যত দ্রুত চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনার মধ্যে যাওয়া যাবে, তত ভালো ফল পাওয়া যাবে।

চিকিৎসার জন্য চাই ওষুধ ও আচরণগত পদ্ধতির সম্মিলিত প্রয়াস, নচেৎ শুধু ওষুধে এ রোগ সারে না। এক্ষেত্রে তাই বাবা-মা অথবা অভিভাবকের ভূমিকা সর্বাগ্রে।

  • বিহেভিয়ারাল থেরাপি আচরণগত চিকিৎসা

মা-ববার যা করণীয়—

ADHD আক্রান্ত বাবা তার মা-বাবা এবং শিক্ষকের কাছ থেকে যেদি উপযুক্ত গাইডেন্স ও ভালোবাসা পায় তবে সে তার মধ্যেকার সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারবে এবং পরীক্ষায় সফল হতে পারবে। এ অসুখ ডায়াগনোসিস হওয়ার সাথে সাথেই শিশুটির ফ্যামিলিতে হতাশা, এক-অপরকে দোষারোপ এমনকী ক্রোধও দেখা দিতে পারে। তাই শিশুটির সাথে সাথে তার মা-বাবারও বিশেষ সাহায্যের প্রয়োজন আছে মনের এই খারাপ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার। এ ব্যাপারে মনোচিকিৎসকের ভূমিকা অপরিহার্য। মেন্টাল হেলথ প্রফেশনাল বা মনোচিকিৎসক বাবা-মা’র সঙ্গে আলাদাভাবে বসবেন এবং শিশুর রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। বাবা-মা’কে শেখাবেন শিশুকে পরিচর্যা করার বিভিন্ন উপায়। যেমন—

  • শিশুকে একটি রুটিনের মধ্যে রাখুন। যেমন নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া-স্নান-পড়তে বসা-খেলতে যাওয়া ইত্যাদি।
  • শিশুর ভালো কাজের জন্য প্রশংসা ও উৎসাহ দান। একে বলে ‘পজিটি বিহেবিয়ার’-কে রিউনফোর্স করা। অর্থাৎ শিশুটি এর মাধ্যমে ভালো কাজে উৎসাহ পাবে।
  • অন্যদিকে খারাপ কাজে নিরুৎসাহিত করার জন্য তাকে সুবিধা দান থেকে বঞ্চিত করুন অথবা বিষয়টিকে ইগনোর করতে শিখুন।
  • শিশুটি যদি কোনো অসহ্য আচরণ করে, তবে বকাঝকা না করে তাকে কিছুক্ষণের জন্য এই জায়গা থেকে অন্যত্র সরিয়ে রাখা এবং শান্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। একে বলা হয় ‘টাইম-আইট’ পদ্ধতি।
  • শিশুকে খোলা মাঠে খেলতে দিন।
  • শিশুকে অবশ্যই স্কুলে দেবেন এবং নিয়মিত স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।

কিছু সহজ মনস্তাত্ত্বি পদক্ষেপ রয়েছে যাতে স্কুলে শিশুটির চঞ্চলতা বা অন্যমনস্কতা কাটানো যায়, যেমন শিশুটিকে প্রথম সারিতে বা শিক্ষকের পাশে বসানো, যাতে সে সহজেই ডিসট্র্যাক্ট না হতে পারে অথবা ওই বিশেষ শিশুটির জন্য একজন শিক্ষক নির্দিষ্ট করে দেওয়া যাতে শিশুটির দৈনন্দিন অ্যাসাইনমেন্ট সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয় তা তিনি আলাদাভাবে দেখবেন। এবং এইভাবে শিশুটির পড়াশোনায় ফল ভালো হতে পারে।

  • শিশুটিকে সামাজিকতা শেখাতে হবে এবং তাকে বন্ধু বানাতে সাহায্য করতে হবে।

ওষুধ

ADHD-র চিকিৎসায় দুৎধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়—স্টিমুল্যান্টস যেমন মিথাইল ফেনিডেট, অ্যাম্ফেট্যামিনস ইত্যাদি এবং নন-স্টিমুল্যান্ট যেমন এটোমোক্সেটিন, ক্লোনিডিন। তবে ছ’বছর বয়সের নিচে শিশুদের সাধারণত ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয় না। এবং শুধুমাত্র ওষুধে এ রোগ সারে না। তবে ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করলে ADHD-র লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শিশুটির মনোনিবেশ ঘটাতে ও স্কুলের পড়াশোনায় উন্নতি ঘটে। বর্তমানে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, জিষ্ক, ম্যাঙ্গানিজ ও আয়োডিন-এর ভূমিকা সম্পর্কে গবেষণা চলছে।

ADHD শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে লানিং ডিসএবেলিটি (যেমন পড়া, বানান করা, লেখা বা অঙ্ককেয়ায় সমস্যা), ডিপ্রেশন, ঘুমের সমস্যা, বিছানায় প্রস্রাব করার সমস্যাও থাকতে পারে। এগুলোও চিকিৎসার প্রয়োজন। তবে মনে রাখা দরকার, ADHD আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। তারা সমাজের অংশ এবং যথাযোগ্য চিকিৎসা ও বিকাশের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment