সন্তান প্রতিপালন ছেলেমেয়েদের বিষয় : কান দিয়ে দেখবেন না

729 Views 0 Comment

আমার আপনার ঘরের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আজকাল নানা রকমের মানসিক উদ্বেগ, উৎকন্ঠা দেখা যায়। কখনও কখনও সমস্যা এত প্রবল হয় যে মানসিক বিপর্যয় ঘটে থাকে। অনেক ছেলেমেয়েই মানসিক অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাবা-মা অভিভাবকের স্বাভাবিক ভাবেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। এই ধরনের মানসিক সমস্যা বা বিপর্যয় কিন্তু অনেক সময় আগের থেকে সতর্ক হলে যেমন এড়ানো সম্ভব তেমন এর প্রকোপও অনেক কম হয়। স্বাভাবিক ভাবে সদাব্যস্ত বা নানারকমের কাজকর্মে জড়িয়ে যাওয়ার জন্যে বাবামায়েরা সময় দিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে বা ঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারেন না। অভিভাবকরা কী করবেন, কীভাবে, ছেলেমেয়দের ব্যাপারে সতর্ক হবেন সে বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

  • ছেলেমেয়ে যে বড় হচ্ছে সেটা বুঝুন। অনেক বাবা-মা কৈশোরে পড়া বা কৈশোর উত্তীর্ণ ছেলেমেয়েকেও খোকা-খুকু করে রাখেন। এটা কিন্তু বাবা-মায়েদের ‘ছেলেমানুষী’ছাড়া কিছু নয়। দশ-বারো বছর বয়সের ছেলেমেয়েদের অনেক মা খাইয়ে দেন। এটা কি ঠিক? এই বয়স থেকে তাদের দায়িত্ব দিন, তারা যেন স্বালম্বী হতে পারে। ছেলেমেয়েদের ছোট বয়স থেকে শুধু উপদেশ বা নির্দেশ দিলে হবে না। তারা যে বড় হচ্ছে, তাদের স্বনির্ভর হতে হবে, এটাও বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। এতে তাদের একগ্রতা, আত্মবিশ্বাস বাড়ে, হীনস্মস্যতাবোধ দূর হয়।
  • টি.ভি, মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান ছেলেমেয়েদের সামনে বিজ্ঞাপন জগত, বিনোদন জগত থেকে শুরু করে অনেক কিছুই জানিয়ে থাকে। তারা খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে বেতাল বা অস্বাভাবিক চাহিদা যেন ছেলেমেয়েদের মনকে আচ্ছন্ন না করে। সে যেন বাবা-মায়ের সঙ্গতি, পরিবারের ঐতিহ্য ও ক্ষমতা সম্বন্ধে ভূল না বোঝে। তার চাহিদার রেশ বাবা-মাকেই টানতে হবে। অতৃপ্তি, না পাওয়ার কষ্ট অনেক সময় হতাশা আনে।

সবচেয়ে বড় কথা সে যেন বাবা-মাকে চাহিদা পূরণের জন্য অপব্যবহার না করে! অনেক অভিভাবক নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ, আত্মীয়স্বজনদের সমালোচনা ইত্যাদি সব কিছুই সন্তানের সামনে করে থাকেন। এটা সমর্থনযোগ্য নয়। এতে ছেলেমেয়েরা যেমন পরিবারের অন্য গুরুজন, শিক্ষক-শিক্ষিকাকে সম্মান করতে শিখবে বা তেমনি নিজের মা-বাবাকেও অমান্য করতে শিখবে।

ছেলেমেয়েদের মনে প্রতিযোগিতার প্রেরণা, লড়াই করে জেতার প্রেরণা দিন কিন্তু বাস্তব থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন না। তার যেন স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে স্বার্থপর, ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে না ওঠে।

যৌনআবেগ নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষাও দরকার। সারাক্ষণ আকাঙক্ষা পূরণ করার চেষ্টা বা নারী-পুরুষের  যৌনসম্পর্ক সম্বন্ধে অত্যধিক আগ্রহ অনেক সময় মনকে উৎকন্ঠিত করে থাকে। তাতে লেখাপড়ারও ক্ষতি হয়। খেলাধুলো, ছবি আঁকা, গানবাজনা কিন্তু সতত যৌনআবেগ, যৌন আকাঙক্ষা মেটাবার চেষ্টার থেকে মনকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। শুধু লেখাপড়া নয়, ছেলেমেয়েদের খেলাধুলোতেও উৎসাহ দিন।

সমস্যা এই লেখাপড়া ও খেলাধুলো নিয়েও। লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে, এই পুরনো ধারণা অনেক বাবা-মা বা অভিভাবকের থাকে। লেখাপড়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু লেখাপড়া শিখেও অনেকে বেকার। স্বনির্ভর হবার সুযোগ পায় না। শিক্ষিত বেকার দেশে বড় কম নয়। সত্যিই অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে ভালো রেজাল্ট করেও জীবিকাহীন, জানাশোনা না থাকলে বা অর্থ উৎকোচ না দিয়ে উপযুক্ত ছেলেমেয়েই বাধাধরা জীবন পছন্দ করে। চাকরি প্রিয়। সাহস করে ব্যবসা করতে, স্বনির্ভর কোনো প্রকল্প বা ব্যবসা-বাণিজ্যে আগ্রহী হয় না। অনেকেরই ব্যবসার মূলধনের সমস্যা। সরকারি ঋণ বা ব্যাষ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার সাহস থাকে না। সাহস যুবক-যবতীরা নিশ্চয় বাবা-মায়ের থেকে কিনবে না। তাই শৈশব থেকে বাবা-মা, অভিভাবকদের উৎসাহ ও উপযুক্ত সাহস তৈরির প্রচেষ্টা দরকার। আজকাল ক্রীড়াজগতে প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থ উপার্জনের অসুবিধে থাকে না। ছেলেমেয়েদের মধ্যে ক্রীড়াপ্রতিভা থাকলে তার বিকাশের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দরকার। মা-বাবাকেই তা করতে হবে। ছেলেমেয়েদের মানসিকতা, দক্ষতা প্রভৃতি বিচার-বিবেচনা করা দরাকার।

সন্তান প্রতিপালন প্রসঙ্গে বাবা-মা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব অপরিসীম। কিন্তু তাই বলে আমি সারাদিন ছেলেমেয়েদের নিয়ে পড়ে থাকতে বলছি না। অবশ্য খুব ছোট বয়স থেকে স্কুলে পাঠানো এবং তার পরেই স্কুলগুলোর অতিরিক্ত নিয়ম, শৃ্ঙ্খলা ও লোকদেখঅনো শিক্ষা দেবার নাম করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ওপর রীতিমতো মানসিক নির্যাতন হয়। অনেক মা-বাবাকেই দেখি নিজেদের সাধ্য-সামর্থের বাইরে গিয়ে শূধূমাত্র মোহ ও আশা নিয়ে তথাকথিত বড় নামী স্কুলে ভর্তি করান অন্যের কাছে নিজের স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য বা নিছক অহংকারবশত। তার ফলে স্কুলের আদব-কায়দা, অস্বাভাবিক ‘ফি’ ইত্যাদির জন্য তারা অতিরিক্ত উপার্জন বা অবৈধ উপার্জনের পথে পা বাড়িয়ে দেন। এ বিষয়ে সত্যিই সতর্কতা প্রয়োজন।

আমি অনেক ছেলেমেয়েকে জানি যারা অতি সাধারণ স্কুল, সরকারি স্কুল প্রভৃতিতে লেখাপড়া করে জীবনে শুধু প্রতিষ্ঠিত হননি, মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। বাবামায়েদের অনুরোধ সাধ্যের বাইরে গিয়ে কিছু করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সৎ প্রচেষ্টা শুভ ভাবনা। সন্তানের মঙ্গলকামনায় আন্তরিকতা। অমুকের ছেলে কী করছে, বন্ধুর মেয়ে নামী ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে ইংরেজি বলছে দেখে চমকে যাবেন না। কত বড় বগ সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, নামী ব্যক্তিত্ব অতি সাধারণ স্কুলে পড়েছেন। কিন্তু মনে রাখবেন জীবনে বড় হবার, প্রতিষ্ঠিত হবার মানসিকতা, সাহস, উৎসাহ তারা শুধু স্কুল থেকে নয়, অন্য কোথাও পেয়েছেন। বাবা-মা শুধু সমালোচনা বা হতাশা, উৎকন্ঠা দেখাবেন আর ছেলেমেয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে তা হয় না।

  • মনে রাখবেন মা-বাবার হতাশা উৎকন্ঠ ছেলেমেয়েদের ওপর প্রতিফলিত হয়। তারাও হীনম্মন্যতাবোধে ভুগতে থাকে। হতাশ হয়ে পড়ে। রাগ,বিরক্ত জম্মায়। আপনার ছেলে বা মেয়েকে বোঝাবার চেষ্টা করুন। ওর চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছ-অনিচ্ছা লক্ষ করুন। নিজেই বোঝাবার চেষ্টা করুন। দেখবেন ঠিক বুঝতে পারছেন। দয়া করে ছেলেমেয়েদের বিষয়ে ‘কান দিয়ে দেখবেন না’। সন্তান সম্বন্ধে কে কী বলল অমনি সেটাকে অন্ধের মতো মেনে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা করবেন। আজকাল স্কুলগুলোতে ছেলেমেয়েদের শুধু মেধার প্রতিযোগিতাই নয়, জামাকাপড়, টিফিনের খাবার, বাবামায়ের প্রত্তিপত্তি, অর্থ, গাড়ি এমনকী সেলফোন নিয়েও প্রতিযোগিতা চলে। এর মধ্যে দিয়েই সন্তানকে বড় হতে হবে। সাধ্যের বাইরে গিয়ে অর্থ, জিনিসপত্র ছেলেমেয়েকে না দিয়ে বরং বাস্তব সত্যটুকু বুঝিয়ে বলুন। প্রথমে ছেলেমেয়ে হতাশ হবে। আশাভঙ্গের জন্যে বিরক্তি, রাগ দেখাবে কিন্তু দেখবেন বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই পরে বুঝতে পারবে।
  • ব্যক্তিত্বের সমস্যায় আক্রান্ত ছেলেমেয়ে বা নিউরোসিস-আক্রান্ত ছেলেমেয়েদেরে নিয়ে সমস্যা হলেও হতে পারে। দরিদ্রতা পাপ নয় বা অপরাধ নয়, ছেলেমেয়ে সেটা বুঝুক। অহংকার জীবনের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান বা চরিত্রের কোনো মহৎ গুণ নয়, বরং বিনয় ও মধুর ব্যবহারেই আজকালকার দিনে খুবই আকাল, সেটা যেন ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারে। বাবা-মায়েদের কাছে আমার অনুরোধ ছেলেমেয়ে কত নামী-দামী স্কুলে পড়ছে তা নিয়ে অহংকার না করে বরং সে কেমন মানুষ হচ্ছে, তার আচার-ব্যবহার নিয়ে গর্ব করতে শিখুন। আর যাই হোক এই পণ্যমানসিকতার যুগে ছেলেমেয়েকেও ‘পণ্য দ্রব্য’ করে তুলবেন না। আজকের দিনে সামাজিক মানুষের বড় অভাব। সন্তানের সামাজিক পরিণতি খুবই প্রয়োজনীয়। সে পরিবারের বা সংসারের সকলের সঙ্গে ঠিকভাবে মেলামেলা করতে পারছে কি না দেখা দরকার। অনেক ছেলেমেয়েই লেখাপড়াতে খুবই ভালো কিন্তু দু’চারজন বন্ধু-বান্ধব ছাড়া অন্যান্যদের সঙ্গে সহজে মেলামেশা করতে পারে না। মেলামেশা করতেই চায় না। এক ধরনের ‘সোস্যাল অটিজম’লক্ষ করা যায়। এ বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।

  • সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন
0 Comments

Leave a Comment