সাদা বিষের তিন কাহন

612 Views 0 Comment
সাদা বিষের তিন কাহন

আমাদের শরীরে মেটাবলিক কাজকর্মের জন্য নুনের অবদান অসীম। নুনের রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। সাধারণত আমরা যেটা খাই সেটা হল আয়োডাইজড নুন।

দৈনিক এক চামচ বা ১৫০০ মি.গ্রা নুন আমাদের শরীরে প্রয়োজন। যদি কারো খুব বেশি নুনের প্রয়োজন হয় তাহলে তার পরিমাণ হবে ২০০০ থেকে ৩০০০ মি.গ্রাম মধ্যে।

নুন না হলে যেমন চলে না তেমনি এর ক্ষতিকারক দিকও কম নয়। যাদের হাই ব্লাডপ্রেসার আছে তাদের ক্ষেত্রে ডাক্তারবাবুরা তো প্রেশক্রিপসনের ওপরে লিখেই দেন সল্ট রেসট্রিক্টেড ডায়েট। দৈনিক যদি বেশি নুন গ্রহণ করা হয় তাহলে ব্লাডপ্রেসার, হার্টের সমস্যা, শরীর ফোলা, ইডিমা পর্যন্ত হতে পারে। নুন বেশি খাবার ফলে শরীরে ফ্লুইড বাড়ে এবং সেটা বেরোতে না পারার কারণে কিডনির সমস্যা, চোখের সমস্যাও আসতে পারে। করোনারি ধমনীর অসুখ, সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসও হতে পারে শরীরের নুন বেশি যাওয়ার কারণে।

আবার শরীরে নুন কম থাকার কারণে হাইপোন্যাট্রিমিয়া হয়। হাইপোন্যাট্রিমিয়া হবার আগে যে সমস্যাটা হয় তা হল—মাথার যন্ত্রণা, বমি বমি ভাব, মাসল ক্র্যাম্প, খিদে কমে যাওয়া ইত্যাদি। এই সময় রোগী খাবারে যা নুন পায় ডাক্তারবাবুরা তার থেকে সোডিয়াম একটু বাড়িয়ে দেন। চায়ের চামচের এক চামচ অর্থাৎ পাঁচ গ্রাম নুন চব্বিশ ঘন্টায় সারাদিনের খাবার বা সরবতের মধ্যে দিয়ে গ্রহণ করতে বলা হয়।

নুনের অভাবে রেনাল ফেলিওর, হিট স্ট্রোক, ক্লান্তি, রক্তে সোডিয়ামের অভাব জনিত অসুবিধে এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কাজ ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আজকাল ফাস্টফুডে মানুষ ভীষণভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাইনিজ রান্নায় চীনা নুন বা আজিনামোটো খুব বেশি ব্যবহার করা হয় যা ক্যানসার রোগকে ডেকে আনতে সাহায্য করে। আধুনিক পদ্ধতিতে খাদ্য সংরক্ষণ নুনের অত্যধিক ব্যবহারের কারণে স্টম্যাক ক্যানসার বাড়ছে। নুন খাবারের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান হলেও খুব বেশি পরিমাণে তা শরীরে যাওয়া মানেই কিন্তু সাদা বিষকে শরীরে প্রবেশ করানো। লবণাক্ত আচার, লবণ সংরক্ষিত খাবার কথনোই ব্যবহার করা উচিত নয়। সেই কারণে টিনফুড বা প্যাকেটজাত খাবার, যা সংরক্ষণে অত্যধিক পরিমাণে সোডিয়াম ব্যবহার করা হয় তা ভবিষ্যতে পাকস্থলি, ইসোফেগাস, কোলন ক্যানসারের কারণ হতে পারে।

তাই পরিমিত নুন গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত নুন, চাইনিজ নুন যা আজিনামোটো নামে পরিচিত—এগুলো কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই বিষ। এই সাদা বিষ থেকে দূরে থাকুন।

চিনি বা সুগার : চিনি কম খেতে হবে কারণ সুগার সম্বন্ধে বলা হয় এটাই খাবারের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। সুগারে কোনো ক্যালরি নেই। লোকে বলে সুগার খেলে ক্যালোরি বাড়বে। বেসিক ব্যাপার কিন্তু তা নয়। সুগার এনার্জি লেভেল বাড়ায়। সুগার যখন আমাদের শরীরে প্রবেশ করে তখন দু’টো ভাগে ভেঙে যায়—গ্লুকোজ এবং ফ্রুকটোজ। গ্লুকোজ আমাদের শরীরে রক্তের মধ্যে ঢুকে যায় আর ফ্রুকটোজটা ভেঙে গিয়ে শরীরে ফ্যাট তৈরি করে।

বেশি চিনি খেলে সেটা দাতের পক্ষেও খুব খারাপ। দাতে ব্যাক্টেরিয়া তৈরি করে এই চিনি। তাছাড়া চিনি বেশি খেলে আমাদের শরীরে যে নর্মাল ইনসুলিন আছে, সেটা বেড়ে যায়। একটা সময় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে যায়। সুগার খেয়ে যাচ্ছে কিন্তু ইনসুলিন আর বেরোচ্ছে না। তার থেকে তৈরি হয় টাইট-টু ডায়াবেটিস। এভাবেই ওবেসিটি তৈরি হয়। সুগারের কারণে অন্ধত্ব এমনকী হার্টের সমস্যাও আসে।

চিনি যারা খায় তারা খুব অ্যাডিক্টেড হয়ে যায়, চিনি ছাড়া তারা চলতে পারে না। চিনি আমাদের শরীরে প্রয়োজন। কিন্তু যতটা পারা যায় ততটাই কম খাওয়া ভালো। ডায়াবেটিস থাকলে তো একদমই চিনিকে বাদ দিতে হবে।

ময়দা : আটার তুলনায় অনেক মিহি হয় এবং এতে শর্করার পরিমাণ থাকে বেশি। শরীরে প্রবেশ করে সুগারকে বাড়িয়ে তোলে, প্রোটিন তো কমেই। ছিবড়ের ভাগও অনেক কম। প্রোটিনের ভাগ থাকে ১১ শতাংশ।এমনকী যে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম হাড় গঠনের জন্য বিশেষ উপকারি, সেই সব উপাদানও কমে যায়। ময়দা দিয়ে তৈরি ভাজা জিনিস যেমন লুচি, পরোটা, সিঙাড়া শরীরে ফ্যাট তৈরি করে। অতিরিক্ত ময়দার ব্যবহার হার্টের সমস্যা, আর্থ্রাইটিস, আরো যেটা হতে পারে ক্যানসারও হয়।

ময়দা প্রতিদিন ব্যবহার করলে কনস্টিপেশন, হজমের গন্পগোল এমনকী গ্যাস্ট্রাইটিসও হতে পারে। তাই ডাক্তারবাবুরা ময়দাতেও সাদা বিষ আখ্যা দেন।

সৌজন্যে: ‘সুস্বাস্থ্য’ – কলকাতা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় স্বাস্থ্য বিষয়ক ম্যাগাজিন

0 Comments

Leave a Comment